কলকাতা: পরিবেশগত ও আইনিভাবে সুরক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (East Kolkata Wetlands - EKW) আজ গুরুতর সংকটের মুখে। প্রায় ১২,৫০০ হেক্টর (১২৫ বর্গ কিমি) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই জলাভূমি শুধুমাত্র কলকাতার বর্জ্য জল শোধনের জন্য 'কলকাতার কিডনি' নামেই পরিচিত নয়, বরং এর পরিবেশগত গুরুত্ব এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবেও এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
রামসার সাইট ও আইনি সুরক্ষা:
২০০২ সালে রামসার সাইট (Ramsar Site) হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করার পর, এই জলাভূমির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। পরে, ২০০৬ সালে রাজ্য সরকার 'East Kolkata Wetlands (Conservation and Management) Act, 2006' কার্যকর করে। এই আইনের অধীনে East Kolkata Wetlands Management Authority (EKWMA) গঠিত হয়, যার প্রধান কাজ হলো জলাভূমির সংরক্ষণ, অবৈধ ভরাট ও দখলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ঐতিহ্যবাহী মাছ চাষ ও কৃষিকাজকে সুরক্ষা দেওয়া।
জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতি:
একসময় ২৬৪টিরও বেশি মাছের পুকুর, ধান ও সবজির ক্ষেত ছিল এই জলাভূমির প্রাণকেন্দ্র। শহরের বর্জ্য জল প্রাকৃতিক শোধনের পর এই জলে মাছ চাষ ও কৃষিকাজ চলত, যা থেকে প্রতি বছর ১০,০০০ টনেরও বেশি মাছ উৎপাদিত হতো। অসংখ্য পরিযায়ী পাখির আনাগোনায় মুখরিত হতো এখানকার পরিবেশ। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, উদ্ভিদ ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল এই জলাভূমি স্থানীয় মানুষের জীবিকারও অন্যতম প্রধান উৎস।
বর্তমান সংকট:
আইনি সুরক্ষা ও কর্তৃপক্ষের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও, জলাভূমি ভরাট করে বসতি স্থাপন, শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষিজমি ও মাছের পুকুর ভরাট করে অবৈধ নির্মাণ চলছে বলে অভিযোগ। এর ফলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় মানুষের প্রথাগত জীবিকাও সংকটাপন্ন। বর্জ্য জলের প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়ায় শোধন প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে, যা শহরের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই অমূল্য সম্পদকে রক্ষা করতে হলে আইনি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ এবং কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। পাশাপাশি, স্থানীয় মানুষ এবং পরিবেশকর্মীদের সচেতনতা ও প্রতিরোধও জরুরি। এই জলাভূমির সংরক্ষণ কেবল পরিবেশগত দায়িত্বই নয়, এটি কলকাতার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


