ভূমিকা: হামাস, যা 'হারাকাত আল-মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়া' (ইসলামিক প্রতিরোধ আন্দোলন) এর সংক্ষিপ্ত রূপ, ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত গাজা উপত্যকায় এর রাজনৈতিক শাসন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ কার্যক্রমের মাধ্যমে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিন ইস্যুর শিকড় ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের প্রথম দিকে জায়নবাদী বসতি স্থাপনকারীদের আগমন এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতিতে প্রোথিত। এই জটিল ইতিহাস এবং এর ধারাবাহিক প্রভাব বর্তমান সংঘাতের মূল কারণ।
হামাসের উত্থান ও বিবর্তন:
হামাস শেখ আহমেদ ইয়াসিন দ্বারা গাজায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৭ সালে, প্রথম ইন্তিফাদা (ফিলিস্তিনি গণঅভ্যুত্থান) শুরু হওয়ার পরপরই। এর আদর্শিক ভিত্তি মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। প্রাথমিকভাবে, হামাস ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধকে তার প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে। ১৯৯০-এর দশকে হামাস একটি বিস্তারিত সনদ প্রকাশ করে, যেখানে তারা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের সম্পূর্ণ ভূমি জুড়ে একটি ইসলামিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি দাবি করে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে হামাসের প্রভাব বৃদ্ধি পায় ২০০৬ সালের ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচনে তাদের বিজয়ের মাধ্যমে। এই বিজয় ফাতাহ পার্টির সঙ্গে তাদের তীব্র সংঘাতের জন্ম দেয়, যা ২০০৭ সালে হামাসকে গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে উৎসাহিত করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল এবং মিশর গাজা উপত্যকায় কঠোর অবরোধ আরোপ করে, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। এই অবরোধ গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। এরপর থেকে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় আকারের সংঘাত হয়েছে, যার মধ্যে ২০০৮-০৯, ২০১২, ২০১৪, ২০২১ সালের যুদ্ধগুলি এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে চলমান সংঘাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি সংঘাতই উভয় পক্ষে ব্যাপক প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণ হয়েছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
ফিলিস্তিন ইস্যুর উৎস ইউরোপে ১৯ শতকের শেষ দিকে রাজনৈতিক জায়নবাদের উত্থানের সাথে জড়িত। এই সময়ে ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসন বাড়তে থাকে, যা স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের ভূমি হারানোর ভয় তৈরি করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণায় ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি 'জাতীয় আবাসভূমি' প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন জানায়, যা আরবদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর, ইহুদিদের উপর চালানো হলোকাস্টের ফলে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসনের চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে একটি ইহুদি এবং একটি আরব রাষ্ট্রে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেয় (জাতিসংঘের প্রস্তাবনা ১৮১), যা আরব পক্ষ প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে প্রায় ৭,৫০,০০০ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হয়, যাকে ফিলিস্তিনিরা 'নাকবা' (মহাবিপর্যয়) বলে স্মরণ করে।
১৯৬৪ সালে ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, সিনাই উপদ্বীপ, পূর্ব জেরুজালেম এবং গোলান হাইটস দখল করে নেয়, যা সংঘাতকে নতুন মাত্রা দেয়। এরপর ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ এবং ১৯৮৭ সালের প্রথম ইন্তিফাদা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের তীব্রতা বাড়ায়।
১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে ইসরায়েল ও পিএলও একে অপরকে স্বীকৃতি দেয় এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য পশ্চিম তীর ও গাজার কিছু অংশে সীমিত স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়। তবে এই চুক্তি ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারেনি এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপন অব্যাহত থাকে। ২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয়, যা শান্তি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ধাক্কা দেয়।
হামাস এবং আধুনিক সংঘাতের গতিপ্রকৃতি:
হামাসকে একদিকে গাজার শাসক হিসেবে একটি রাজনৈতিক দল এবং অন্যদিকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী উভয় হিসেবেই দেখা হয়। তাদের সম্পর্ক কেবল ইসরায়েলের সাথেই নয়, পশ্চিম তীরের ফাতাহ-নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাথেও প্রায়শই সংঘাতপূর্ণ। হামাস ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে, তবে ২০১৭ সালের সংশোধিত সনদে তারা ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমানার মধ্যে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গ্রহণ করার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা তাদের অবস্থানে একটি সম্ভাব্য নমনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
হামাসের রকেট হামলা এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযান উভয়ই গাজায় ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি করেছে। ঘনবসতিপূর্ণ গাজা উপত্যকায় বারবার সংঘটিত যুদ্ধগুলি হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রায়শই এই সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায়, কিন্তু নিরাপত্তা, দখলদারিত্ব এবং শান্তির বিষয়ে গভীর মতপার্থক্য সংঘাতের সমাধানকে কঠিন করে তুলেছে।
চলমান ইস্যু এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ:
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে জটিল বিরোধগুলির মধ্যে একটি। এর মূল কারণগুলি হলো ঐতিহাসিক অভিযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদ, ভূখণ্ডের দাবি, শরণার্থী সমস্যা এবং জেরুজালেম ও অন্যান্য পবিত্র স্থানগুলির ধর্মীয় তাৎপর্য। জেরুজালেমের মর্যাদা এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপন অব্যাহত থাকা সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ।
নানা সময়ে শান্তি উদ্যোগ, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি (১৯৭৮), মাদ্রিদ সম্মেলন (১৯৯১) এবং বিভিন্ন 'রোডম্যাপ' প্রস্তাব করা হলেও, পুনরায় সহিংসতা এবং উভয় পক্ষের আস্থার অভাবে তা প্রায়শই ব্যর্থ হয়েছে। গাজা এবং পশ্চিম তীরের মানবিক পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে, যা এই অঞ্চলগুলিতে স্থিতিশীলতা আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অক্ষমতাকে তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধবিরতির জন্য বিভিন্ন চুক্তি এবং মধ্যস্থতার চেষ্টা চললেও, গভীর অবিশ্বাস এবং অমীমাংসিত মূল সমস্যাগুলি স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনাকে দূর করে রাখছে। এই সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য উভয় পক্ষকে অতীতের তিক্ততা ভুলে, দীর্ঘস্থায়ী এবং ন্যায়সম্মত একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলোচনায় বসতে হবে, যা ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, এবং একই সাথে ইসরায়েলের নিরাপত্তার উদ্বেগগুলিও মোকাবিলা করবে। একটি স্থায়ী শান্তি স্থাপন কেবল এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হবে।