নিজস্ব সংবাদদাতা, তুফানগঞ্জ, ৩০ নভেম্বর ২০২৫: গতকালের (২৯ নভেম্বর) পড়ন্ত দুপুরে তুফানগঞ্জ দেখল এক বিরল দৃশ্য। রাজনীতি আর সংস্কৃতি যেখানে মিলেমিশে একাকার। একদিকে স্লোগান, অন্যদিকে ভাওয়াইয়া গানের সুর। সিপিআই(এম) কোচবিহার জেলা কমিটির ডাকে ‘তুফানগঞ্জ চলো’ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত আর কেবল দলীয় কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রইল না, তা রূপ নিল সাধারণ মানুষের আবেগঘন গণজাগরণে।
ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দিন আহমেদের জন্মভিটাকে হেরিটেজ ঘোষণা এবং সেখানে উচ্চমানের চর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবিতে হাজারো মানুষের ঢল নামল রাস্তায়। আয়োজকদের প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে বেলা ১টা বাজতেই তুফানগঞ্জ শহর কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, শিল্পী, সাহিত্যপ্রেমী মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই সমাবেশে অংশ নেন।
আবেগের বিস্ফোরণ ও মানুষের ঢল:
সমাবেশস্থলে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। মাইকে যখন বেজে উঠল "ও কি গাড়িয়াল ভাই...", তখন উপস্থিত অনেকের চোখেই ছিল জল। বক্তারা মঞ্চ থেকে ক্ষোভ উগরে দেন প্রশাসনের দীর্ঘদিনের উদাসীনতার বিরুদ্ধে। তাদের প্রশ্ন, "যে মানুষটি বাংলা গানকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিলেন, তার নিজের মাটিতেই তিনি কেন ব্রাত্য?"
সমাবেশ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়, আব্বাসউদ্দিনের জন্মভিটা বলরামপুরকে অবিলম্বে সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করে সেটিকে জাতীয় মানের পর্যটন ও সংস্কৃতি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
দাবি ও হুঙ্কার:
এদিন সমাবেশে উপস্থিত সিপিআই(এম) নেতৃত্ব এবং বিশিষ্ট ভাওয়াইয়া শিল্পীরা একযোগে জানান, এই সমাবেশ কেবল শুরু। প্রশাসন যদি দ্রুত এই দাবি মেনে না নেয়, তবে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবে কোচবিহার।
নেতৃত্বের কথায়, "এটা কেবল ইট-পাথরের লড়াই নয়, এটা আমাদের আত্মপরিচয়ের লড়াই। আব্বাসউদ্দিন আহমেদ আমাদের আবেগের নাম। তাঁর স্মৃতিকে ধুলোয় মিশতে দেব না আমরা। এই সফল সমাবেশ প্রমাণ করে দিল, কোচবিহারের মানুষ তাদের শিকড়কে ভোলেনি।"
সাংস্কৃতিক শপথ:
কর্মসূচি শেষে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখা যায়। উপস্থিত জনতা হাত তুলে শপথ নেন, ভাওয়াইয়া সম্রাটের সম্মান রক্ষায় তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন। সন্ধ্যার মুখে সমাবেশ শেষ হলেও, তুফানগঞ্জের বাতাসে যেন তখনও ভাসছিল প্রতিবাদের সুর আর ভাওয়াইয়ার মেঠো টান।
‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’র এই পর্ব যে এতটা সফল হবে, তা সম্ভবত বিরোধীরাও আন্দাজ করতে পারেননি। ২৯ নভেম্বরের এই জনপ্লাবন বুঝিয়ে দিল, ভাওয়াইয়া সম্রাট আজও উত্তরের মানুষের হৃদয়ে কতটা জীবন্ত। এখন দেখার, এই বিপুল জনসমর্থনের পর প্রশাসন কবে তাদের নীরবতা ভাঙ্গে।