" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory চা বাগানের কান্না থেকে পরিযায়ী শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস: ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’য় উঠে আসা এক বিপন্ন জনপদের আখ্যান //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

চা বাগানের কান্না থেকে পরিযায়ী শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস: ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’য় উঠে আসা এক বিপন্ন জনপদের আখ্যান

 


নিজস্ব সংবাদদাতা, কোচবিহার: শীতের উত্তুরে হাওয়া যখন ডুয়ার্সের চা বাগান ছুঁয়ে সমতলে নামছে, তখন সেই হাওয়ায় কেবল ঠান্ডার আমেজ নেই, আছে এক দীর্ঘশ্বাসের ভারী গন্ধ। রাজনীতির চেনা ছকে সাধারণত প্রতিশ্রুতি আর পাল্টা দোষারোপের খেলাই দেখা যায়। কিন্তু গত ২৯ নভেম্বর কোচবিহারের তুফানগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া সিপিআই(এম)-এর ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ সেই চেনা ছক ভেঙে উত্তরবঙ্গের এক রূঢ় ও মর্মান্তিক বাস্তবকে সামনে এনেছে।

১১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পদযাত্রা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি যেন এক ‘সোশ্যাল অডিট’—যা গত এক দশকের উন্নয়নের ফানুস ফুটো করে বের করে এনেছে চা শ্রমিক, পরিযায়ী মজুর আর স্বপ্নভঙ্গ হওয়া যুবসমাজের হাহাকার।

১৮ টাকার অপমান ও রিসর্টের বিলাসিতা
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির মেরুদণ্ড চা শিল্প আজ ধুঁকছে। যাত্রাপথে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ আন্দোলনের পর চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির যে আশ্বাস মিলেছে, তা মাত্র ১৮ টাকা। যেখানে বাজারে একটি ডিমের দাম ৭ টাকা, সেখানে এই বৃদ্ধিকে শ্রমিকরা দেখছেন 'নিছক প্রহসন' হিসেবে।



যাত্রায় অংশগ্রহণকারী এক প্রবীণ চা শ্রমিকের কথায়, "আমাদের রক্ত জল করা শ্রমে পাতা তৈরি হয়, আর আমাদেরই পেটে ভাত জোটে না।" এর চেয়েও বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জমি। অভিযোগ উঠছে, চা বাগানের ১৫% থেকে ৩০% জমি—যা আদতে বাগানেরই অংশ—তা তুলে দেওয়া হচ্ছে বড় পুঁজিপতিদের হাতে বিলাসিবহুল রিসোর্ট ও হোটেল তৈরির জন্য। যাত্রার নেতাদের প্রশ্ন, "শ্রমিকের সন্তান কি তবে আপনাদের তৈরি রিসোর্টে পর্যটকদের এঁটো বাসন মাজবে?" ভূমিপুত্রদের জমি কেড়ে নিয়ে এই করপোরেট তোষণ উত্তরবঙ্গে ক্ষোভের বারুদ জমাচ্ছে।

বন্ধ স্কুল, খোলা মদের দোকান: হারানো প্রজন্মের উপাখ্যান
যাত্রার অন্যতম বিচলিত করা পরিসংখ্যান হলো শিক্ষা বনাম নেশার সমীকরণ। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যখন প্রায় ৮,৩২২টি সরকারি প্রাথমিক ও জুনিয়র হাইস্কুলে তালা ঝুলছে, ছাত্রের অভাবে বা শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে শিক্ষা ব্যবস্থা—ঠিক সেই সময়েই রাজ্যজুড়ে ডানা মেলেছে ২২,০০০ মদের দোকান।



‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’র বক্তারা অভিযোগ করছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত সামাজিক অবক্ষয়। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরলে দেখা যাচ্ছে, কর্মহীন যুবকরা হতাশা ভুলতে নেশার কবলে পড়ছেন, অথবা পাড়ি দিচ্ছেন ভিনরাজ্যে।

পরিযায়ী জীবন ও নারী পাচারের অভিশাপ
"পেট এখানে, কাজ সেখানে"—এই মন্ত্রেই আজ বাঁচতে বাধ্য হচ্ছে উত্তরবঙ্গ। কোচবিহার থেকে আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি—প্রতিটি জেলার ছবি এক। কাজের অভাবে গ্রামের যুবকরা দলে দলে হরিয়ানা, কেরালা, মহারাষ্ট্রে পাড়ি দিচ্ছেন।



সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি নারী পাচারের ক্ষেত্রে। বক্তাদের দাবি, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে উত্তরবঙ্গের হাজার হাজার মেয়েকে ভিনরাজ্যে পাচার করা হচ্ছে। ২০১১ সালের পর দেশে কোনো জনগণনা (Census) না হওয়ায়, কত মেয়ে নিখোঁজ বা কত মানুষ রাজ্য ছেড়েছেন, তার কোনো সরকারি খতিয়ান নেই। কল্যাণ বর্মন নামে মিছিলে হাঁটা এক যুবকের কথায়, "আমরা চাই না আমাদের বাড়ির মেয়েদের আর কাজের খোঁজে দিল্লি যেতে হোক। আমরা আমাদের মাটিতেই রুটি-রুজি চাই।"

দিল্লি-কলকাতা ‘সেটিং’ ও তদন্তের প্রহসন
রাজনীতির ময়দানে তৃণমূল ও বিজেপির একে অপরের প্রতি আক্রমণ কি শুধুই লোকদেখানো? ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’য় এই প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ১০০ দিনের কাজের টাকা চুরির অভিযোগে সরব বিজেপি, অথচ তদন্তের ফল শূন্য।



বক্তাদের তথ্যানুযায়ী, জলপাইগুড়িতেই প্রায় ৪৫ হাজার শ্রমিক তিন বছর ধরে তাঁদের ন্যায্য মজুরি পাননি। দিল্লি থেকে সাত-সাতটি কেন্দ্রীয় দল তদন্তে এলেও, আজ পর্যন্ত কেউ শাস্তি পায়নি। বক্তাদের কটাক্ষ, "কেন্দ্রীয় দল আসে, এসি ঘরে থাকে, ভালোমন্দ খায় আর চলে যায়।" ‘সঁইয়া ভয়ে কোতোয়াল’—এই প্রবাদ মনে করিয়ে দিয়ে বাম নেতৃত্বের দাবি, দুর্নীতিগ্রস্তদের বাঁচাতে শাসক ও বিরোধীর মধ্যে এক অলিখিত সমঝোতা চলছে।



‘লাল হটাও’র পরবর্তী দশা: এক মোহভঙ্গের ইতিবৃত্ত
একসময় ‘লাল হটাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে উত্তাল হয়েছিল বাংলা। মানুষ ভেবেছিল পরিবর্তন মানেই মুক্তি। কিন্তু দেড় দশক পর সেই মোহভঙ্গ হয়েছে। যাত্রার আয়োজকদের দাবি, লাল হটেছে ঠিকই, কিন্তু 

মীনাক্ষী মুখার্জি ও মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্বে এই যাত্রা যখন গ্রামের মেঠো পথ ধরে এগোচ্ছে, তখন রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের চোখেমুখে এক অদ্ভুত মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ক্লান্তি, অন্যদিকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুপ্ত বাসনা।

‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলবে তা সময়ই বলবে। কিন্তু এই যাত্রা নিঃসন্দেহে উত্তরবঙ্গের অবহেলিত মানুষের দগদগে ঘা-গুলোকে উসকে দিয়েছে এবং ক্ষমতার অলিন্দে থাকা শাসকদের সামনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে: উন্নয়নের বিজ্ঞাপনের আড়ালে আর কতদিন ঢাকা থাকবে এই বিপন্ন জনপদের কান্না?

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies