নিজস্ব প্রতিনিধি, হায়দ্রাবাদ | ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬
রাত পোহালেই হায়দ্রাবাদের আরটিসি কল্যাণ মণ্ডপ (RTC Kalyana Mandapam) হয়ে উঠবে ভারতের নারী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। আগামীকাল, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হচ্ছে সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি (AIDWA)-র ১৪তম জাতীয় সম্মেলন। একদিকে যেমন আগামী চার দিন ভারতের বর্তমান নারী সমাজের সংকট নিয়ে কাটাছেঁড়া হবে, তেমনই এই সম্মেলন মনে করিয়ে দিচ্ছে এক দীর্ঘ ও রক্তঝরা ইতিহাসকে।
ইতিহাসের শেকড়: তেভাগা থেকে আজকের হায়দ্রাবাদ
এই আন্দোলনের জন্ম কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে হয়নি। এর জন্ম হয়েছিল ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের বাংলায়। ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছিল 'বঙ্গীয় প্রাদেশিক মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি'। সেই সময়ে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী-র মতো নেত্রীরা বুঝেছিলেন, নারীর মুক্তি দেশের মুক্তি ছাড়া সম্ভব নয়।
১৯৪৭-এর দেশভাগের ক্ষত, তেভাগা আন্দোলন, তেলেঙ্গানার সশস্ত্র সংগ্রাম—প্রতিটি বাঁকেই কমিউনিস্ট আদর্শে অনুপ্রাণিত এই নারীরা লড়াই করেছেন। এরপর ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি গঠন এবং অবশেষে ১৯৮১ সালে মাদ্রাজের (চেন্নাই) সম্মেলনে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মহিলা সংগঠনগুলো একজোট হয়ে জন্ম দেয় আজকের 'AIDWA'-র। সেই স্মৃতি আজ হায়দ্রাবাদের রাজপথে ফিরে আসছে, যেখানে পাপ্পা উমানাথ, প্রমীলা পান্ডে এবং ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগালের মতো কিংবদন্তিদের উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে আসছেন আজকের প্রতিনিধিরা।
কালকের সূচি: এক নতুন সংগ্রামের সূচনা
আগামীকাল ২৫ জানুয়ারি বিকেল থেকেই হায়দ্রাবাদের রাজপথ প্রকম্পিত হবে স্লোগানে। একটি বিশাল প্রকাশ্য সমাবেশের মাধ্যমে চার দিনের এই কর্মযজ্ঞ শুরু হবে।
বক্তা: মঞ্চে থাকবেন প্রাক্তন সাংসদ বৃন্দা কারাত, জাতীয় সভানেত্রী পি.কে. শ্রীমতী, সাধারণ সম্পাদিকা মারিয়াম ধাওয়ালে এবং চলচ্চিত্র জগতের প্রতিবাদী মুখ রোহিনী।
অংশগ্রহণ: ভারতের ২৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ১০০০ প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া প্রতিনিধিদের কণ্ঠে শোনা যাবে বাংলার সেই চিরচেনা লড়াইয়ের গান।
মূল লক্ষ্য: মর্যাদা, অধিকার ও সুরক্ষা
এবারের সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়গুলো ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির আয়না। প্রতিনিধিদের আলোচনায় বারবার উঠে আসবে:
অর্থনৈতিক সংগ্রাম: সমান কাজের জন্য সমান মজুরি এবং ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা।
সামাজিক সুরক্ষা: নারী পাচার ও গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ।
সাম্প্রদায়িকতার প্রতিরোধ: বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক ধর্মনিরপেক্ষ ভারত গড়ার ডাক।
আন্তর্জাতিক সংহতি: এই সম্মেলন থেকে প্যালেস্টাইনের অধিকার রক্ষার দাবিতেও প্রস্তাব পেশ করা হতে পারে।
এক অবিরাম যাত্রা
১৯৮১ সালে যখন এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন সদস্য সংখ্যা ছিল সীমিত। আজ ১১ কোটিরও বেশি সদস্য নিয়ে এটি ভারতের বৃহত্তম নারী সংগঠন। মাত্র এক টাকার সদস্য ফি দিয়ে শুরু হওয়া এই সংগঠনটি আজও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর।
হায়দ্রাবাদের এই সম্মেলনে প্রতিনিধিরা শুধু রাজনৈতিক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করবেন না, তাঁরা একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করবেন তাঁদের চোখের জল আর লড়াইয়ের জেদ। কালকের ভোরের সূর্য যখন হায়দ্রাবাদে উঠবে, তখন তা কেবল এক নতুন দিনের সূচনা করবে না, বরং আট দশকের এক দীর্ঘ সংগ্রামের মশালকে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে।


