তদন্তে: বিশেষ প্রতিনিধি | পুনে/বারামতি
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬
বুধবার সকাল ৮টা ৪২ মিনিট। বারামতি বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে আকাশ থেকে একটি অগ্নিপিণ্ড আছড়ে পড়ল মহারাষ্ট্রের মাটিতে। মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল ভারতের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত নাম—অজিত পাওয়ারের জীবন। কিন্তু এই দুর্ঘটনা কি শুধুই প্রতিকূল আবহাওয়ার শিকার, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর অবহেলা?
দুর্ঘটনার সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত
মুম্বইয়ের জুহু বিমানবন্দর থেকে সকাল ৮টা নাগাদ উড়ান শুরু করেছিল লিয়ারজেট ৪৫ মডেলের চার্টার্ড বিমানটি (VT-SSK)। গন্তব্য ছিল উপমুখ্যমন্ত্রীর নিজের গড় বারামতি। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসে মাঝারি কুয়াশার কথা থাকলেও, অবতরণের ঠিক আগে বারামতির দৃশ্যমানতা (Visibility) হঠাৎ ৪০০ মিটারের নিচে নেমে যায়।
তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রানওয়ে স্পর্শ করার কয়েক সেকেন্ড আগে বিমানটি অস্বাভাবিকভাবে ডানদিকে হেলে পড়ে এবং একটি সজোরে বিস্ফোরণ ঘটে। বারামতি বিমানবন্দরের এটিসি (ATC) সূত্রে খবর, শেষ মুহূর্তে পাইলট সুমিত কাপুর রানওয়ে দেখতে না পেয়ে 'গো-অ্যারাউন্ড' (উড্ডয়ন বাতিলের চেষ্টা) করার সিগন্যাল দিয়েছিলেন, কিন্তু ইঞ্জিন থেকে কাঙ্ক্ষিত গতি মেলেনি।
উইংসে থাকা সেই পাঁচ যোদ্ধা: যাঁদের জীবন কেড়ে নিল এই ট্র্যাজেডি
বিমানে থাকা পাঁচজন আরোহীর প্রত্যেকেই ছিলেন স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের ভূমিকাও এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে:
অজিত পাওয়ার (৬৬): মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী এবং এনসিপি (অজিত পাওয়ার গোষ্ঠী) প্রধান। তাঁর মৃত্যুতে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
বিদিপ জাধব: উপমুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা অফিসার। সংকটের সময় তিনি কী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা তদন্তাধীন।
ক্যাপ্টেন সুমিত কাপুর (পাইলট-ইন-কমান্ড): ৫,০০০ ঘণ্টারও বেশি ওড়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ক্যাপ্টেন সুমিত এই বিমানে অভিজ্ঞতার প্রতীক ছিলেন।
ক্যাপ্টেন শম্ভবী পাঠক (কো-পাইলট): মাত্র ২৫ বছর বয়সী এই মেধাবী পাইলট ছিলেন আগামী দিনের নক্ষত্র। দিল্লির সেনা পরিবারের এই কন্যার মৃত্যুতে এভিয়েশন সেক্টরে শোকের ছায়া।
পিঙ্কি মালি (ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট): দীর্ঘ ৭ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পিঙ্কি ভিভিআইপি ফ্লাইটের প্রোটোকল সামলাতে দক্ষ ছিলেন।
অনুসন্ধানের কেন্দ্রে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ডিজিসিএ (DGCA) এবং এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB) এখন তিনটি দিক থেকে তদন্ত পরিচালনা করছে:
১. যান্ত্রিক অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণ (VSR Ventures)
লিয়ারজেট ৪৫ বিমানটি যে কোম্পানির অধীনে ছিল (VSR Ventures), তাদের গত এক বছরের মেইনটেন্যান্স লগ বুক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। বিমানে কি কোনো পুরনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল যা বারবার অগ্রাহ্য করা হয়েছে? দুর্ঘটনার ঠিক আগে ইঞ্জিনের শব্দে অস্বাভাবিকতা ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন।
২. কেন এই ঝূঁকিপূর্ণ অবতরণ?
কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় যখন দৃশ্যমানতা নিরাপদ সীমার নিচে ছিল, তখন কেন পাইলটকে ল্যান্ডিং করার অনুমতি দেওয়া হলো? পুনের কাছে অন্য কোনো বিকল্প বিমানবন্দরে (Diversion) কেন পাঠানো হলো না? এর পেছনে কি কোনো রাজনৈতিক তাড়া বা 'ভিভিআইপি প্রেশার' কাজ করেছিল?
৩. ব্ল্যাক বক্স ও শম্ভবীর শেষ বার্তা
ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (CVR) থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেষ ১ মিনিটে পাইলট ও কো-পাইলটের মধ্যে কোনো উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। কো-পাইলট শম্ভবী তাঁর পরিবারকে পাঠানো শেষ বার্তায় কি কোনো ঝুঁকির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন?




