নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুর, ১১ জানুয়ারি ২০২৬:
ইস্পাত নগরী দুর্গাপুর। ভোরের সাইরেন যেখানে হাজারো মানুষের ঘুম ভাঙায়, চিমনির কালো ধোঁয়ায় যেখানে মিশে থাকে অজস্র শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস। এই শহরের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে আছে এমন হাজারো 'ঠিকা শ্রমিক', যাদের ঘামেই সচল থাকে অর্থনীতির চাকা, অথচ লভ্যাংশের খাতায় তাদের নাম থাকে সবথেকে নিচে। চরম বৈষম্য, ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক আর 'না-পাওয়ার' বেদনাই যাদের নিত্যসঙ্গী, সেই মানুষগুলোর জীবনেও যে বসন্ত নামতে পারে, রবিবার তা দেখল দুর্গাপুরের ট্রাঙ্ক রোড।
সিটু (CITU) অনুমোদিত সংগঠনসমূহ (UCWU/ASPCEU/TCEU)-এর উদ্যোগে 'চিত্তব্রত মজুমদার ভবনে' আয়োজিত 'ঐক্য ও সম্প্রীতির মিলন উৎসব ২০২৬' কেবল একটি অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল এক মানবিকতার মহাকাব্য।
জীবনের দৌড়ে পিছিয়ে নেই বিশেষ তারারা
এদিনের উৎসবের সবথেকে আবেগঘন এবং উজ্জ্বল মুহূর্তটি রচিত হলো যখন খেলার মাঠে নামলেন সমাজের তথাকথিত 'বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন' মানুষেরা। শারীরিক সীমাবদ্ধতা যে মনের জোরের কাছে কত তুচ্ছ, তা তাঁরা প্রমাণ করে দিলেন প্রতিটি পদক্ষেপে। যারা হয়তো সমাজের মূলস্রোতে চলতে গিয়ে হোঁচট খান, এদিন তাঁরাই দৌড়ালেন, খেললেন এবং বিজয়ীর হাসি হেসে পুরস্কার তুলে নিলেন হাতে। গ্যালারিতে বসা হাজারো শ্রমিকের চোখে তখন আনন্দের জল। এই দৃশ্য বুঝিয়ে দিল, লাল পতাকার তলায় কেউ করুণার পাত্র নয়, সবাই সমান অধিকারের দাবিদার। তাঁদের এই অদম্য জেদ উপস্থিত সবাইকে শিখিয়ে গেল—লড়াইটা শুধু কারখানার গেটে নয়, লড়াইটা নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করারও।
সংস্কৃতির মেলবন্ধনে শ্রান্ত প্রাণের আরাম
সারা বছর মেশিনের যান্ত্রিক শব্দে যাদের কান ঝালাপালা হয়ে যায়, এদিন তাঁদের মনের খোরাক জোগাল শহরের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলো। 'লহরী', 'মুক্ত মঞ্জরী', এবং 'শব্দরূপ'-এর মতো স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলির পরিবেশনা ছিল এক কথায় অনবদ্য। গান, নাটক আর আবৃত্তির ছন্দে ক্ষণিকের জন্য উধাও হয়ে গেল অভাব-অনটনের ক্লান্তি। শহরের বিশিষ্ট শিল্পীরা তাঁদের সুরের জাদুতে মিলিয়ে দিলেন মেহনতি মানুষের হৃদস্পন্দনকে। শিল্পীরা প্রমাণ করলেন, শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে গেলে শুধু স্লোগান নয়, সুরের ছোঁয়াও বড় প্রয়োজন।
নেতৃত্ব নয়, যেন পরিবারের অভিভাবক
শ্রমিকদের এই আনন্দযজ্ঞে শামিল হতে এদিন উপস্থিত ছিলেন সিটু পশ্চিম বর্ধমান জেলা নেতৃত্বের শীর্ষলগ্নের ব্যক্তিত্বরা। কিন্তু মঞ্চে তাঁরা নেতা হিসেবে নয়, উপস্থিত ছিলেন পরিবারের অভিভাবক হিসেবে। জেলা নেতৃত্ব গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জি ও পার্থ মুখার্জি ঘুরে দেখলেন প্রতিটি বিভাগ, কথা বললেন শ্রমিকদের পরিবারের সাথে। মহিলা নেত্রী শিল্পী চক্রবর্তী এবং দেবমিতা চট্টোপাধ্যায়-এর উপস্থিতি নারী শ্রমিক ও কর্মীদের পরিবারের মধ্যে এক আলাদা উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এল, "আজকের এই উৎসব প্রমাণ করে, আমরা কেবল সহকর্মী নই, আমরা কমরেড, আমরা এক বৃহৎ পরিবার।"
শ্রেণী সংগ্রামের ভিন্ন রূপ
রবিবার দুর্গাপুরের চিত্তব্রত ভবন চত্বর যেন এক টুকরো মুক্ত পৃথিবী হয়ে উঠেছিল। স্ত্রী-সন্তানদের হাত ধরে আসা ধুলো-মাখা মানুষগুলোর মুখে ছিল পরিতৃপ্তির হাসি। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই তো রোজ চলে, কিন্তু বছরের শুরুতে এই যে একটু কাঁধ খোলা শ্বাস নেওয়া—এটাই তো বেঁচে থাকার রসদ।
আজকের এই 'ঐক্য ও সম্প্রীতির উৎসব' এক জোরালো বার্তা দিয়ে গেল—শ্রেণী সংগ্রাম মানে শুধু দাবিদাওয়া আদায়ের হুঙ্কার নয়, শ্রেণী সংগ্রাম মানে একে অপরের সুখে-দুখে পাশে থাকা, বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরা, আর সংস্কৃতির চর্চায় মনকে শাণিত করা। ২০২৬-এর এই রবিবাসরীয় সকাল দুর্গাপুরের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায় হয়ে রইল।























