১. দেশব্যাপী সংগ্রামের প্রস্তুতি: ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ ধর্মঘটের ঘোষণা
কেন্দ্রীয় সরকারের বিতর্কিত শ্রম কোডকে কেন্দ্র করে ভারত এক বৃহত্তর শ্রমিক অসন্তোষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। দেশের প্রধান ট্রেড ইউনিয়নগুলি একজোট হয়ে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের যে ডাক দিয়েছে, তা কেবল একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি নয়, বরং সরকারের প্রতি এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। এই বিভাগটি সেই ঘোষণার বিস্তারিত বিবরণ এবং এর কৌশলগত তাৎপর্য তুলে ধরবে।
সেন্টার অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (CITU) এবং অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়নগুলির একটি যৌথ মঞ্চ, সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার সমর্থনে, আপাতত ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। এই ধর্মঘটের মূল এবং একমাত্র দাবি হলো চারটি বিতর্কিত শ্রম কোড সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা।
এই একদিনের ধর্মঘটকে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের জন্য একটি "সতর্ক ঘণ্টা" হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, যদি সরকার নিয়মাবলী বিজ্ঞপ্তি জারি করে বা অন্য কোনো উপায়ে শ্রম কোডগুলি জোরপূর্বক কার্যকর করার চেষ্টা করে, তবে শ্রমিকরা আগামী দিনে "বহু-দিনের সাধারণ ধর্মঘট এবং প্রতিরোধের বৃহত্তর রূপ" নিয়ে তার জবাব দেবে এবং শ্রম কোডগুলি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এই কঠোর পদক্ষেপের পেছনের কারণগুলি নতুন শ্রম কোডের নির্দিষ্ট বিধানগুলির মধ্যেই নিহিত রয়েছে।
২. কেন এই বিরোধিতা? বিতর্কিত শ্রম কোডের গভীরে বিশ্লেষণ
শ্রমিকদের এই তীব্র বিরোধিতার কারণ বুঝতে হলে, শুধুমাত্র প্রত্যাহারের দাবি নয়, বরং শ্রম কোডগুলির গভীরে প্রবেশ করা আবশ্যক। এই বিভাগটি সেইসব মূল বৈশিষ্ট্যগুলিকে বিশ্লেষণ করবে, যেগুলিকে ট্রেড ইউনিয়নগুলি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত অধিকারের উপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে দেখছে।
CITU-র প্রস্তাব অনুযায়ী, শ্রম কোডগুলি শ্রমিকদের অধিকারের উপর একটি বহুমুখী আক্রমণ। এর প্রধান ক্ষতিকর দিকগুলি হলো:
- ইউনিয়ন ও ধর্মঘটের অধিকার খর্ব: এই কোডগুলি সংগঠিত হওয়া এবং ধর্মঘট করার মতো মৌলিক অধিকারগুলিকে সীমাবদ্ধ করে ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে দুর্বল করার জন্য পরিকল্পিত হয়েছে।
- 'হায়ার অ্যান্ড ফায়ার' নীতির প্রসার: এগুলি 'হায়ার অ্যান্ড ফায়ার' (সহজে ছাঁটাই) নীতিকে উৎসাহিত করে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের কর্মসংস্থান বাড়ায়, যার ফলে দশকের পর দশক ধরে অর্জিত চাকরির স্থায়িত্বের ধারণাটিই মুছে যাবে এবং এক বিশাল অনিশ্চিত শ্রমিক শ্রেণী তৈরি হবে।
- কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি ও সুরক্ষা হ্রাস: কোডগুলি কাজের সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়, পেশাগত সুরক্ষার মানদণ্ডকে লঘু করে এবং বিদ্যমান পরিদর্শন ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলে, যা কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে।
- মালিকপক্ষের দায়মুক্তি: এই আইনগুলি শ্রম বিরোধের জন্য আইনি বিচার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে এবং নিয়োগকর্তাদের দ্বারা শ্রম আইন লঙ্ঘনকে অপরাধমূলক কার্যকলাপের তালিকা থেকে বাদ দেয়। এর অর্থ হলো, মালিকপক্ষ আইন লঙ্ঘন করলেও শাস্তির ভয় থেকে কার্যত মুক্ত থাকবে, যা এক আইনহীন কর্মক্ষেত্রের জন্ম দেবে এবং শ্রমিকদের আইনি আশ্রয় পাওয়ার পথ রুদ্ধ করবে।
CITU-র অভিযোগ অনুযায়ী, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকার "ত্রিপাক্ষিকতাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছে" এবং গত দশ বছর ধরে ট্রেড ইউনিয়নগুলির বারবার দাবি সত্ত্বেও ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্স (Indian Labour Conference) আহ্বান করেনি। প্রায় সমগ্র শ্রমিক শ্রেণীর তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও, সরকার আকস্মিকভাবে শ্রম কোডগুলি বিজ্ঞাপিত করেছে। শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষকে কোডগুলির তথাকথিত সুবিধা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করার জন্য সরকার জনগণের শত শত কোটি টাকা "বিভ্রান্তিমূলক প্রচারে" ব্যয় করছে। শ্রম কোডের এই ধারাগুলোই শ্রমিকদের এক অবশ্যম্ভাবী সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়েছে এবং অভূতপূর্ব শ্রমিক-কৃষক ঐক্যের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
৩. শ্রমিক-কৃষক ঐক্য: এক সম্মিলিত প্রতিরোধ আন্দোলন
শ্রম কোডের বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা নয়, বরং এটি ভারতের প্রধান দুটি উৎপাদক শক্তির মধ্যে একটি ক্রমবর্ধমান এবং শক্তিশালী জোটের প্রতীক। এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে শ্রমিক এবং কৃষকরা তাদের অধিকার রক্ষার জন্য একত্রিত হয়েছে, যা এই সংগ্রামের পরিধি এবং তাৎপর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালের ২৬শে নভেম্বর দেশব্যাপী যে বিশাল প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছিল, তা এই ঐক্যের এক চমৎকার নিদর্শন। দেশের ৫০০টিরও বেশি জেলায় হাজার হাজার স্থানে—কর্মক্ষেত্র, শিল্পাঞ্চল এবং গ্রামীণ এলাকাগুলিতে—বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। এই আন্দোলনে সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের পাশাপাশি সামিল হয়েছিলেন সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মচারী, স্কিম কর্মী, এবং সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার সমর্থনে অগণিত কৃষি শ্রমিক ও কৃষক। ছাত্র ও যুব সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই প্রতিরোধকে এক নতুন মাত্রা দেয়।
এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধকে প্রস্তাবে "দেশের দুটি উৎপাদক শক্তি—শ্রমিক ও কৃষকদের ক্রমবর্ধমান ঐক্যের প্রতিফলন" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সম্মিলিত শক্তি কেবল সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং একটি বার্তা দিচ্ছে যে দেশের অর্থনীতি ও সমাজের ভিত্তি যারা তৈরি করে, তারা তাদের অধিকারের উপর কোনো আঘাত সহ্য করবে না। এই তৃণমূল স্তরের ঐক্য থেকে জন্ম নেওয়া শক্তিই সরকারের নীতির পেছনের গভীরতর আদর্শগত কারণগুলিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
৪. বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: কর্পোরেট স্বার্থ বনাম শ্রমজীবী মানুষের অধিকার
ট্রেড ইউনিয়নগুলির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শ্রম কোডগুলি নিছক একটি আইনি পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। CITU-র মতে, এই পদক্ষেপগুলি শাসক শ্রেণীর মূল উদ্দেশ্যকে প্রতিফলিত করে, যা শ্রমিকদের অধিকারের বিনিময়ে কর্পোরেট স্বার্থকে রক্ষা করা।
CITU-র মূল যুক্তি হলো, শ্রম কোডগুলির বিজ্ঞপ্তি জারি করা আসলে "শাসক কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক আঁতাতের" একটি মরিয়া প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে পুঁজিবাদের পদ্ধতিগত সংকটকে পুঁজিপতি শ্রেণীর পক্ষে সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর জন্য শ্রমিক শ্রেণীর মৌলিক এবং বহু কষ্টে অর্জিত অধিকারগুলির উপর আক্রমণ করা হচ্ছে। এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো কর্পোরেট মালিকদের "ইউনিয়ন-মুক্ত কর্মক্ষেত্র" উপহার দেওয়া এবং তাদের "অতিরিক্ত মুনাফা" অর্জনে সহায়তা করা।
CITU এই অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের উপর একটি বৃহত্তর আক্রমণের সাথে যুক্ত করেছে। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে জনগণের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে। একই সাথে, শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যকে ব্যাহত করার জন্য "সাম্প্রদায়িক ও বিভেদমূলক উত্তেজনা" ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ভয়াবহ বিশ্লেষণ শ্রমিক শ্রেণীকে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে।
৫. চূড়ান্ত আহ্বান: এই সংগ্রাম "হারার বিলাসিতা নেই"
সমস্ত প্রেক্ষাপট এবং ঝুঁকির মূল্যায়নের পর, CITU-র প্রস্তাবটি একটি চূড়ান্ত এবং আপোসহীন সংগ্রামের আহ্বানের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। এই বার্তাটি ভারতীয় শ্রমিক শ্রেণীর ভবিষ্যতের জন্য এই লড়াইয়ের গুরুত্বকে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে।
CITU-র ১৮তম জাতীয় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক দাবি এবং প্রস্তাবগুলি নিম্নরূপ:
- দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের প্রতি পূর্ণ সমর্থন।
- চারটি শ্রম কোডের অবিলম্বে প্রত্যাহার।
- সরকারের কর্পোরেট-পন্থী ও জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক, যুব এবং অন্যান্য শ্রমজীবী অংশের ঐক্যকে শক্তিশালী করার আহ্বান।
সম্মেলন থেকে CITU-র সমস্ত অনুমোদিত ইউনিয়ন, রাজ্য কমিটি এবং সর্বভারতীয় ফেডারেশনগুলিকে অবিলম্বে ধর্মঘটের সাফল্যের জন্য প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে সমস্ত শ্রমিকদের প্রতি, তাদের দলমত নির্বিশেষে, এই "ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে কোমর বেঁধে নামার" আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে শ্রমিক-বিরোধী সরকারকে শ্রম কোডগুলি বাতিল করতে বাধ্য করা যায়।
প্রস্তাবটি শেষ হয়েছে এক অমোঘ সতর্কবার্তা দিয়ে: "এই সম্মেলন আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই সংগ্রাম হারার বিলাসিতা তাদের নেই।"


