নিজস্ব প্রতিনিধি, ইন্দোর | ৬ জানুয়ারি, ২০২৬
ভারতের মানচিত্রে যে শহরটি বছরের পর বছর 'সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর'-এর মুকুট পরে গর্ব করেছে, আজ সেই ইন্দোরই এক ভয়াবহ শোকের ছায়ায় ঢাকা। পরিচ্ছন্নতার সেই ঝকঝকে আবরণের নিচে লুকিয়ে থাকা প্রশাসনিক গাফিলতির বিষ আজ সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে। নর্দমার দূষিত জল পানীয় জলের পাইপে মিশে গিয়ে ভাগীরথপুরা এলাকায় তৈরি হয়েছে এক মৃত্যুমিছিল।
কান্না থামছে না স্বজনহারাদের
সরকারি খাতায় মৃতের সংখ্যা ৬-৭ বলা হলেও, স্থানীয় সূত্রে খবর সংখ্যাটা ইতিমধ্যেই ১৫ থেকে ১৭ ছাড়িয়ে গেছে। শতাধিক মানুষ এখনও হাসপাতালের বিছানায় জীবনের সাথে লড়াই করছেন। এক মায়ের আর্তনাদ বা এক বৃদ্ধ বাবার অসহায় চোখের জল আজ প্রশ্ন তুলছে— "আমরা কি অপরাধ করেছিলাম? শুধু এক গ্লাস জল চেয়েছিলাম, বিষ নয়।"
ভাগীরথপুরার অলিগলি আজ নিস্তব্ধ। যে শিশুরা কয়েকদিন আগেও রাস্তায় খেলে বেড়াত, তাদের অনেকেই আজ ডায়েরিয়া আর বমির প্রকোপে অসুস্থ। ১৪০০-র বেশি মানুষ আক্রান্ত, যাদের মধ্যে অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। এমনকি ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার শরীরে ধরা পড়েছে 'গুইলেন-ব্যারে সিন্ড্রোম' (GBS), যা দূষিত জল থেকে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের ফলে তাঁর শরীরকে পক্ষাঘাতের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
প্রশাসনের উদাসীনতা বনাম সাধারণের হাহাকার
বাসিন্দাদের অভিযোগ আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। তাঁরা জানিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরে কল দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত জল বেরোচ্ছিল। বারবার প্রশাসনের দরজায় কড়া নেড়েও মেলেনি কোনো প্রতিকার। আজ যখন একের পর এক চিতা জ্বলছে, তখন নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। মিউনিসিপাল কমিশনারের বদলি বা দুই আধিকারিকের সাসপেনশন— এগুলো কি হারানো প্রাণগুলোকে ফিরিয়ে দিতে পারবে?
"ইন্দোর দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর, তবু এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল? এতে শহরের ভাবমূর্তি দেশজুড়ে ধুলিসাৎ হয়েছে।" — মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট
হাইকোর্টের কড়া চাবুক
আজ মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চের রায়ে সেই যন্ত্রণারই প্রতিধ্বনি শোনা গেল। আদালত রাজ্য সরকারকে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করে জানিয়েছে, পরিষ্কার পানীয় জল পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার দায় কার? মুখ্যসচিবকে আগামী ১৫ জানুয়ারি ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আপাতত ট্যাঙ্কারে করে জল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এলাকাবাসীর মন থেকে আতঙ্ক কাটছে না। শহরজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন— যে শহর পরিচ্ছন্নতায় প্রথম হয়, সেই শহরের মানুষ কেন বিশুদ্ধ জলের অভাবে প্রাণ হারাবে? রাজনীতির কাদা ছোঁড়াছুড়ি চলতেই থাকবে, কিন্তু ভাগীরথপুরার যে ঘরগুলো আজ অন্ধকার হয়ে গেল, সেই শূন্যতা কি কোনোদিন পূরণ হবে?
ইন্দোর আজ কাঁদছে। আর এই কান্না কেবল একটি শহরের নয়, এটি ভারতের জল ব্যবস্থাপনা ও সাধারণ মানুষের প্রাণের দাম নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন।


