তারিখ: ১২ জানুয়ারি, ২০২৬
স্থান: চট্টগ্রাম / কলকাতা
বিশেষ প্রতিবেদন: ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাস—যেদিন ভারত স্বামী বিবেকানন্দের জন্মতিথি উদযাপন করে, ঠিক সেই দিনটিকেই ব্রিটিশ শাসকরা বেছে নিয়েছিল তাঁর এক মানসপুত্রকে হত্যা করার জন্য। আজ ১২ জানুয়ারি, মাস্টারদা সূর্য সেনের প্রয়াণ দিবস। ১৯৩৪ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম জেলের ফাঁসির মঞ্চে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের কলঙ্কিত ইতিহাসের এক জঘন্যতম অধ্যায় রচনা করেছিল। তারা ভেবেছিল একটি প্রাণ কেড়ে নিলেই বিদ্রোহের আগুন নিভে যাবে, কিন্তু তারা জানত না, তারা কোনো সাধারণ মানুষকে নয়, বরং একটি আদর্শকে হত্যা করার চেষ্টা করছিল।
অন্তিম লগ্ন ও সেই ঐতিহাসিক চিঠি
১৯৩৪ সালের ১১ জানুয়ারি রাত। চট্টগ্রাম কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ অনুভব করছিলেন সূর্য সেন। কিন্তু তাঁর চোখে কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক প্রশান্ত দৃঢ়তা। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন সেই অবিস্মরণীয় চিঠি:
"মৃত্যু আমার দরজায় কড়া নাড়ছে। আমার মন আজ অনন্তের পানে ধাবমান... এমন শান্ত, এমন গম্ভীর মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য কী রেখে গেলাম? মাত্র একটি জিনিস—সেটি হলো আমার স্বপ্ন, স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন।"
ইতিহাসের বুকে এক দগদগে ক্ষত: বর্বরোচিত নির্যাতন
মাস্টারদার মৃত্যু ব্রিটিশদের কাছে এতটাই ভয়ের কারণ ছিল যে, তাঁকে সুস্থ শরীরে ফাঁসি দেওয়ার সাহসও তাদের ছিল না। ফাঁসির আগে তাঁর ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা শুনলে আজও শিউরে উঠতে হয়।
জনশ্রুতি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ব্রিটিশরা ভয় পেয়েছিল যে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাস্টারদা যদি একবার 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি দেন, তবে জেলের প্রাচীর ভেঙে বিদ্রোহ শুরু হতে পারে। তাই তাঁকে থামানোর জন্য বেছে নেওয়া হয় পৈশাচিক পথ। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তাঁর দাঁত উপড়ে ফেলা হয়েছিল, ভেঙে দেওয়া হয়েছিল হাত-পায়ের হাড়। যে মানুষটিকে ১২ জানুয়ারি ভোরের আলো ফোটার আগে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তিনি তখন কার্যত অচেতন। তাঁর শরীর ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তাঁর আত্মাকে তারা স্পর্শ করতে পারেনি।
তাঁর সঙ্গেই ফাঁসি দেওয়া হয় তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি তারকেশ্বর দস্তিদারকে।
বঙ্গোপসাগরের বুকে শেষ শয্যা
মাস্টারদার মৃতদেহ নিয়েও ব্রিটিশদের আতঙ্কের শেষ ছিল না। তারা জানত, সূর্য সেনের চিতাভস্ম যদি বাংলার মাটিতে পড়ে, তবে প্রতিটি কণা থেকে জন্ম নেবে হাজারো বিপ্লবী। তাই তাঁর পরিবার বা অনুগামীদের হাতে মৃতদেহ তুলে দেওয়া হয়নি।
ফাঁসির পর মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারের মৃতদেহ লোহার খাঁচায় ভরে একটি স্টিমারে তোলা হয়। এরপর গভীর সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ভারি লোহা বেঁধে তাঁদের পবিত্র দেহ নিক্ষেপ করা হয় বঙ্গোপসাগরের অতল গহ্বরে। ব্রিটিশরা ভেবেছিল, সাগরের লোনা জল বিপ্লবের স্মৃতি ধুয়ে মুছে দেবে। কিন্তু তারা ভুল ছিল। সাগরের ঢেউ আজও সেই ত্যাগের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
এক শিক্ষকের মহাকাব্য
সূর্য সেন কোনো পেশাদার যোদ্ধা ছিলেন না; তিনি ছিলেন অঙ্কের শিক্ষক, এক কবি-প্রাণ মানুষ। কিন্তু তিনিই দেখিয়েছিলেন, কীভাবে একদল ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে প্রবল পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া যায়। তিনি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন ঘৃণার বশে নয়, বরং দেশমাতৃকার প্রতি গভীর ভালোবাসার টানে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা স্মরণ করি সেই মহানায়ককে, যিনি প্রমাণ করেছিলেন—হাড় ভাঙা যায়, শরীর টুকরো করা যায়, অতল সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্নকে কখনো হত্যা করা যায় না।
একনজরে আজকের দিন:
শহিদ দিবস: ১২ জানুয়ারি, ১৯৩৪।
সহ-শহিদ: তারকেশ্বর দস্তিদার।
শেষ বাণী: "মৃত্যু আমার দরজায় কড়া নাড়ছে..."।
শেষকৃত্য: জনরোষের ভয়ে বঙ্গোপসাগরে মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়।




