" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory স্বামী বিবেকানন্দ—যিনি মার্ক্সবাদের আগেই শুনিয়েছিলেন 'শূদ্র জাগরণ'-এর অমোঘ বাণী //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

স্বামী বিবেকানন্দ—যিনি মার্ক্সবাদের আগেই শুনিয়েছিলেন 'শূদ্র জাগরণ'-এর অমোঘ বাণী







নিজস্ব সংবাদদাতা | দুর্গাপুর, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

আজ ১২ই জানুয়ারি। পরাধীন ভারতের তমসাচ্ছন্ন আকাশে যিনি একদা উদিত হয়েছিলেন মধ্যগগনের সূর্যের মতো, সেই যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দের ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী। আজ সারা দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে 'জাতীয় যুব দিবস'। ১৮৬৩ সালের এই দিনে কলকাতার সিমলা স্ট্রিটে জন্মগ্রহণকারী নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে বিশ্বজয়ী স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার যাত্রাটি কেবল একজন সন্ন্যাসীর জীবনকাহিনি নয়, বরং এটি আধুনিক ভারতের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও জাগরণের ইতিহাস।

তবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে স্বামীজিকে কেবল একজন গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর প্রতি সুবিচার করা হবে না। শিকাগো ধর্মমহাসভায় বেদান্তের জয়গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম সারির এক সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ, যিনি কার্ল মার্ক্সের বস্তুবাদী তত্ত্বের সমান্তরালে দাঁড় করিয়েছিলেন এক আধ্যাত্মিক সমাজতন্ত্রের ধারণা।

বিপ্লবী সন্ন্যাসীর উত্থান

শৈশবে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও যুক্তিবাদে বিশ্বাসী নরেন্দ্রনাথের জীবনের মোড় ঘুরে যায় দক্ষিণেশ্বরের কালীসাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সংস্পর্শে এসে। গুরুর কাছে তিনি শিখেছিলেন, "জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর"। এই মন্ত্রই পরবর্তীকালে তাঁর 'ব্যবহারিক বেদান্ত'-এর ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৯৩ সালে শিকাগো ধর্মমহাসভায় তাঁর ওজস্বী ভাষণ ভারতবাসীকে দিয়েছিল হারানো আত্মবিশ্বাস। কিন্তু তাঁর আসল লড়াই ছিল ভারতের দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।

বিবেকানন্দ ও সমাজতন্ত্র: এক গভীর বিশ্লেষণ

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষলগ্নে দাঁড়িয়ে স্বামী বিবেকানন্দ এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যা সমসাময়িক পাশ্চাত্য সমাজবিজ্ঞানীদের কাছেও বিস্ময়কর ছিল। কার্ল মার্ক্স যখন ইউরোপে 'শ্রেণীসংগ্রাম'-এর তত্ত্ব দিচ্ছেন, তার সমসাময়িক সময়েই স্বামীজি ভারতে বসে 'শূদ্র জাগরণ'-এর কথা বলেছিলেন।

আজকের এই বিশেষ দিনে তাঁর সমাজতান্ত্রিক চেতনার কয়েকটি দিক পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:

১. শূদ্র জাগরণ বনাম প্রলেতারিয়েত বিপ্লব

কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন ইতিহাসের চাকা ঘোরে শ্রেণীসংগ্রামের মাধ্যমে। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে পুঁজিবাদের পতনের পর আসবে 'সর্বহারার একনায়কত্ব'। স্বামীজি ইতিহাসকে দেখেছিলেন বর্ণের চক্রাকার আবর্তন হিসেবে—ব্রাহ্মণ (জ্ঞান), ক্ষত্রিয় (অস্ত্র), বৈশ্য (ধন) এবং সবশেষে শূদ্র (শ্রম)।

বিবেকানন্দ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন, "আগামী দিনে শূদ্ররাই বিশ্ব শাসন করবে। এবং সেটা শূদ্র হিসেবেই, ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় হয়ে নয়।" অর্থাৎ, শ্রমজীবী মানুষ তাদের নিজস্ব সত্তা ও অধিকার নিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে। মার্ক্সের 'সর্বহারা বিপ্লব'-এর সাথে স্বামীজির এই 'শূদ্র জাগরণ'-এর আশ্চর্য মিল থাকলেও এর ভিত্তি ছিল ভিন্ন।

২. রুটি বনাম ধর্ম: ব্যবহারিক সমাজতন্ত্র

বিবেকানন্দ নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলতেন এক বিশেষ বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি বলেছিলেন, "আমি সমাজতন্ত্রী এই জন্য যে, আধখানা রুটি একদম না খাওয়ার চেয়ে ভালো।"

মার্ক্সের কাছে ধর্ম ছিল 'আফিম', যা মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। কিন্তু স্বামীজির কাছে ধর্ম ছিল মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি জাগানোর চাবিকাঠি। তিনি বলেছিলেন, খালি পেটে ধর্ম হয় না। তাই আগে অন্ন, পরে ধর্ম। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজতন্ত্র, যা কেবল পেটের ক্ষিধেই মেটাবে না, মানুষের আত্মারও খোরাক জোগাবে। তিনি বুঝেছিলেন, আধ্যাত্মিকতা বর্জিত সমাজতন্ত্র মানুষকে স্বার্থপর ভোগবাদীতে পরিণত করতে পারে।

৩. শ্রেণীসংগ্রাম নাকি শ্রেণী-সমন্বয়?

মার্ক্সবাদ বিশ্বাস করে বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ ও রক্তক্ষয়ী বিপ্লবে। স্বামীজি চেয়েছিলেন 'বিবর্তন' ও 'মানুষ গড়া'র (Man-making) মাধ্যমে পরিবর্তন। তিনি ধনী বা উচ্চবর্ণকে নিশ্চিহ্ন করার কথা বলেননি, বরং তাদের নিচে নেমে এসে দরিদ্রকে ভাই বলে আলিঙ্গন করতে বলেছিলেন। তাঁর আহ্বান ছিল— "হে ভারত, ভুলিও না, নীচজাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই।"

তিনি চেয়েছিলেন উচ্চবর্ণের জ্ঞান ও সংস্কৃতি এবং নিম্নবর্ণের শ্রমশক্তির এক অপূর্ব মিলন।

৪. রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য

সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনেক সময় ব্যক্তির স্বাধীনতা রাষ্ট্রের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়। স্বামীজি এই বিষয়ে সতর্ক ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ ব্যবস্থা যেখানে সমষ্টির স্বার্থে ব্যক্তি ত্যাগ স্বীকার করবে স্বেচ্ছায়, জোর করে নয়। তাঁর মতে, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সাম্য বেশিদিন টেকে না, কিন্তু যে সাম্য ভিতর থেকে, অর্থাৎ আত্মোপলব্ধি থেকে আসে, তাই চিরস্থায়ী হয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিকতা

২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও স্বামীজির প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র কমেনি। আজ যখন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে, যখন যুবসমাজ কর্মসংস্থান ও মানসিক শান্তির খোঁজে দিশেহারা, তখন স্বামীজির 'লোহার মতো পেশী ও বজ্রের মতো স্নায়ু' গড়ার ডাক বড়ই জরুরি।

পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুর থেকে দিল্লি—সর্বত্র আজ যুবরা তাঁর মূর্তিতে মাল্যদান করছে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন তখনই হবে, যখন আমরা তাঁর দেখানো পথে—হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত এক সাম্যবাদী সমাজ গড়ার লক্ষে ব্রতী হব।

স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন এমন এক ঋষি, যিনি মার্ক্সের বস্তুবাদী অর্থনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবাত্মার এক অখণ্ড সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন, অপরকে সাহায্য করা মানে দয়া নয়, বরং নিজেরই বৃহত্তর সত্তার সেবা করা। আজকের এই দিনে আমাদের শপথ হোক—আমরা শুধু তাঁর পূজারী হব না, তাঁর স্বপ্নের ভারত গড়ার কারিগর হব।


Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies