নিজস্ব প্রতিনিধি, মানভূম অঞ্চল:
পৌষের হাড়কাঁপানো শীতকে উপেক্ষা করে আজ ভোরের আলো ফুটতেই বাংলার নদীঘাটগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে ‘টুসু মা’-এর বিদায় সংগীতে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলে টুসু উৎসব কেবল একটি পূজা নয়, এটি এই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং নারীশক্তির এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
উৎসবের গুরুত্ব: মাটির কাছে প্রাণের টান
টুসু কোনো বৈদিক বা পৌরাণিক দেবী নন; তিনি এই মাটির নিজের কন্যা, এক লৌকিক দেবী। গবেষকদের মতে, ‘তুষ’ (ধানের কুঁড়ো) থেকে ‘টুসু’ নামের উৎপত্তি, যা সরাসরি কৃষির সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। কৃষিপ্রধান সমাজে নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ এবং ধরিত্রী মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই এই উৎসব পালিত হয়। এটি একটি অবৈদিক ও অব্রাহ্মণ্য উৎসব, যেখানে কোনো পুরোহিতের প্রয়োজন পড়ে না; সমাজের সাধারণ মেয়েরাই এখানে প্রধান ব্রতী।
প্রধান আচার ও রীতিনীতি
প্রতিষ্ঠা ও পূজা: অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিনে কুমারী মেয়েরা থালায় বা পাত্রে চালের গুঁড়ো, তুষ, ধান ও ফুল দিয়ে টুসু প্রতিষ্ঠা করে। পুরো পৌষ মাস জুড়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় টুসু দেবীর আরাধনা চলে।
টুসু গান: এই উৎসবের প্রাণ হলো টুসু গান। এই গানগুলো কোনো লিখিত পুঁথি নয়, বরং লোকমুখে রচিত। গানের কথায় উঠে আসে গ্রাম্য জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, এমনকি সমকালীন রাজনীতির কথা।
চৌডল ও জাগরণ: মকর সংক্রান্তির আগের রাতে হয় ‘জাগরণ’। রঙিন কাগজ ও শোলার তৈরি বিশালাকার মন্দির সদৃশ কাঠামো বা ‘চৌডল’ তৈরি করা হয়।
বিসর্জন ও মকর স্নান: উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ মকর সংক্রান্তির সকালে মেয়েরা দলবেঁধে চৌডল বা টুসু মূর্তি নিয়ে শোভাযাত্রা করে নদী বা পুকুরে যায়। সেখানে বিসর্জনের করুণ সুরের গানের মাধ্যমে টুসুকে বিদায় জানানো হয়। বিসর্জন শেষে চলে ‘মকর স্নান’ এবং তিল ও চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি বিশেষ পিঠে-পুলি খাওয়ার ধুম।
সামাজিক বন্ধন ও ‘মকর পাতানো’
টুসু উৎসবের আরও একটি বিশেষ দিক হলো সামাজিক সখ্যতা। এই দিনে মেয়েরা একে অপরের সঙ্গে ‘ফুল পাতানো’ বা ‘সই পাতানো’র মাধ্যমে আজীবনের বন্ধুত্বে আবদ্ধ হয়। ছেলেরা মেতে ওঠে ‘ম্যাড়া পোড়ানো’ বা খড়-বাঁশের কাঠামোয় আগুন দিয়ে শীত উদযাপনের উৎসবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের টুসু পরব আবারও প্রমাণ করল যে, শত আধুনিকতার ভিড়েও গ্রামবাংলার শিকড়ের টান আজও অমলিন।


