লিখেছেন: উ-ও চো |
তারিখ: ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
এক বিভীষিকাময় মরীচিকা: মুক্তিদাতা নাকি নতুন শৃঙ্খল?
মিয়ানমারের প্রতিটি ধূলিকণায় আজ বারুদের গন্ধ নয়, বরং এক অদৃশ্য আশঙ্কার দীর্ঘশ্বাস। আমরা যখন দশকের পর দশক ধরে নিজেদের রক্ত আর ঘাম ঢেলে এই মাটিকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখছি, ঠিক তখনই আমাদের মাঝেই কেউ কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে 'ত্রাতা' খুঁজছেন। তারা ভাবছেন, ওয়াশিংটন থেকে আসা কোনো যুদ্ধবিমান বুঝি আমাদের স্বাধীনতার পরোয়ানা নিয়ে আসবে।
কিন্তু ইতিহাস কি আমাদের সেই শিক্ষা দেয়? উ-ও চো-র কলম আজ সেই নির্দয় সত্যকে ব্যবচ্ছেদ করেছে। ৩ জানুয়ারি, ২০২৬—যেদিন ভেনেজুয়েলার রাজপথে শত শত মানুষের নিথর দেহ পড়ে ছিল, আমেরিকা তাকে নাম দিয়েছিল "গণতন্ত্রের উদ্ধার"। সেই রক্তস্নাত কারাকাসের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যারা আজ আমেরিকাকে মিয়ানমারের 'রক্ষাকর্তা' হিসেবে রঙ করতে চায়, তারা কি আসলে অন্ধ, নাকি তারা আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত?
সাম্রাজ্যবাদের রক্তপিপাসা: ভিয়েতনাম থেকে ভেনেজুয়েলা
উ-ও চো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আমেরিকার ইতিহাস কোনো শান্তির কাব্য নয়; এটি লুণ্ঠনের মহাকাব্য। গ্রিনল্যান্ডের বরফে ঢাকা ভূমি থেকে শুরু করে ভেনেজুয়েলার তেলের খনি—সবই তাদের সাম্রাজ্যবাদী ক্ষুধার লক্ষ্যবস্তু। ৮০০টিরও বেশি সামরিক ঘাঁটির লোহার শিকল দিয়ে তারা পৃথিবীকে বেঁধে রাখতে চায়।
সিআইএ-র অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে কত দেশের কপাল পুড়িয়েছে তারা? ফিদেল কাস্ত্রোকে ৬০০ বার হত্যার চেষ্টা থেকে শুরু করে একের পর এক জননির্বাচিত সরকারকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া—এসবই কি তবে আমাদের জন্য 'মুক্তির' উদাহরণ? যারা নিজের দেশের পার্লামেন্টের তোয়াক্কা করে না, যারা আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করে না, তারা কি আমাদের মিয়ানমারের অধিকার রক্ষা করবে?
"আমেরিকার জন্য অন্য দেশের তেল মানে তাদের অধিকার, আর অন্য দেশের প্রতিবাদ মানেই তারা সন্ত্রাসী। এই দ্বিমুখী নীতি কি আমরা বুঝবো না?"
ট্রাম্প: হিটলারের চেয়েও দীর্ঘ এক ছায়া
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম আজ এক আতঙ্কের নাম। উ-ও চো তাকে হিটলারের চেয়েও ভয়ানক এক স্বৈরশাসক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ হিটলারের একটি নির্দিষ্ট সীমানা ছিল, কিন্তু ট্রাম্পের দম্ভের কোনো সীমানা নেই। তিনি জাতিসংঘকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন, জার্মানি থেকে সিঙ্গাপুর—সব মিত্র দেশকে থমকে দিচ্ছেন।
ইউরোপ থেকে এশিয়া, ভারত থেকে ল্যাটিন আমেরিকা—আজ রাজপথগুলো উত্তাল। সাধারণ মানুষ যখন এই ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তখন মিয়ানমারের কিছু মানুষ কেন এক সাম্রাজ্যবাদী মরীচিকার পেছনে ছুটছে?
আমাদের পূর্বপুরুষদের তেজ: লড়াই আমাদের রক্তে
মিয়ানমার কোনো নতুন জন্ম নেওয়া রাষ্ট্র নয়। আমাদের ধমনিতে বইছে সেই সব বীরদের রক্ত যারা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদকে লাথি মেরে বের করেছিল। আমরা সেই জাতি যারা জাপানি ফ্যাসিবাদের বুক চিরে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে এনেছি। সাত দশকের সামরিক বুটের তলায় থেকেও আমাদের যে পূর্বপুরুষরা মাথা নত করেনি, আজ কি আমরা এক ভিনদেশি 'ডলার-প্রভু'র কাছে সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেব?
উ-ও চো অত্যন্ত করুণ স্বরে মনে করিয়ে দিচ্ছেন—ঘরের শত্রু বিভীষণ যুগে যুগে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও কেউ কেউ জাপানিদের দালালি করেছিল। আজও সেই একই ধারার কিছু মানুষ বিদেশি শক্তির দালাল হয়ে মিয়ানমারের স্বাধীনতাকে নিলামে তুলতে চায়। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, মিয়ানমারের জনগণ এখন জেগে উঠেছে।
শেষ কথা: স্বাধীনতা কোনো দান নয়, এটি অধিকার
ভেনেজুয়েলার ভাগ্য আমাদের ললাটে লেপন করতে দেওয়া যাবে না। মিয়ানমারের মাটি হবে মিয়ানমারের মানুষের। আমরা সাহায্য চাই, কিন্তু দয়া বা দাসত্ব নয়। আমাদের সার্বভৌমত্ব কোনো মার্কিন প্রশাসনের তেলের বাণিজ্যের দাবার ঘুঁটি হতে পারে না।
উ-ও চো-এর এই লেখাটি কেবল একটি কলাম নয়, এটি মিয়ানমারের প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। সময় এসেছে চিনে নেওয়ার—কে আসল মিত্র, আর কে মুখোশধারী শত্রু।


