নিজস্ব প্রতিবেদক | ভিয়েনা, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
রাজনীতিতে অনেক সময় একটি মুহূর্তই ইতিহাস বদলে দেয়। কিন্তু কারিন ক্নাইসলের জন্য ২০১৮ সালের ১৮ আগস্টের সেই সোনালী বিকেলটি কোনো ইতিহাস নয়, বরং হয়ে উঠেছিল এক অভিশপ্ত স্মৃতি। অস্ট্রিয়ার আঙুর ক্ষেতের সেই মনোরম পরিবেশে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর এক চিলতে 'ওয়াল্টজ' নাচ আর শেষে গভীর শ্রদ্ধায় করা সেই 'কার্টসি'—এইটুকুই ছিল তাঁর অপরাধ। আর সেই ‘অপরাধের’ মাসুল হিসেবে তাঁকে বিসর্জন দিতে হলো নিজের দেশ, ক্যারিয়ার এবং পরিচয়।
এক নিমন্ত্রণে তছনছ হওয়া জীবন
অস্ট্রিয়ার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কারিন ক্নাইসল যখন পুতিনকে বিয়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেননি ক্রেমলিনের প্রবল প্রতাপশালী নেতা সত্যিই দক্ষিণ অস্ট্রিয়ার সেই ছোট্ট গ্রামে হাজির হবেন। কিন্তু পুতিন এলেন, সঙ্গে নিয়ে এলেন কসাক গায়কদের দল এবং একটি ঐতিহ্যবাহী সামোভার। সেই বিকেলের ক্যামেরায় ধরা পড়া হাসিমুখের ক্নাইসল জানতেন না, লেন্সের ওপারে গোটা ইউরোপ তাঁর রাজনৈতিক মৃত্যু পরোয়ানা লিখছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৎকালীন নেতারা এই নাচকে দেখেছিলেন 'মস্কোর কাছে হাঁটু গেড়ে বসা' হিসেবে। মুহূর্তেই কারিন হয়ে গেলেন নিজ দেশে 'পরিত্যক্ত'। সহকর্মীরা মুখ ফিরিয়ে নিলেন, প্রতিপক্ষরা তাঁকে তকমা দিল ‘পুতিনের চর’ হিসেবে। পরিস্থিতি এতটাই বিষাক্ত হয়ে ওঠে যে, ক্নাইসলকে দেওয়া হতে থাকে খুনের হুমকি।
দেশহীন যাযাবর জীবন
মন্ত্রী পদ হারানোর পর শুরু হয় তাঁর জীবনের চরম লাঞ্ছনা। তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়। নিজের প্রিয় দেশ অস্ট্রিয়াতে তাঁর জন্য কোনো কাজের সুযোগ রাখা হলো না। এক বুক হাহাকার নিয়ে তিনি প্রথমে ফ্রান্সে যান, কিন্তু সেখানেও ‘ক্যানসেল কালচার’-এর অদৃশ্য ছায়া তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। এরপর আশ্রয় খোঁজেন লেবাননে, যেখানে অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটান দীর্ঘ সময়।
কারিন আক্ষেপ করে একবার বলেছিলেন, “আমি কোনো রাজনৈতিক অপরাধ করিনি, শুধু একটি সাধারণ সৌজন্য পালন করেছিলাম। অথচ একটি নাচের জন্য আমাকে সবকিছু হারাতে হলো।”
বর্তমান: সেন্ট পিটার্সবার্গের তুষারপাতে নতুন পরিচয়
আজ ২০২৬ সালে এসে কারিন ক্নাইসল আর ভিয়েনার অভিজাত রাজনৈতিক মহলে নেই। তিনি এখন সেন্ট পিটার্সবার্গের বাসিন্দা। সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভার্সিটির 'G.O.R.K.I.' নামক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের পরিচালক হিসেবে তিনি কাজ করছেন। সম্প্রতি রুশ ট্যাঙ্কার ‘মেরিনারা’ জব্দের ঘটনায় তিনি আন্তর্জাতিক আইনের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে বোঝা যায়—হৃদয় ভেঙে চুরমার হলেও তাঁর মেধা এখনো প্রখর।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, আধুনিক ইউরোপ কি এতটাই কঠোর যে সামান্য এক সৌজন্যের বিনিময়ে একজন উচ্চশিক্ষিত নারীকে ভিটেমাটি ছাড়া করতে পারে? কারিন ক্নাইসলের এই ট্র্যাজেডি আজ কেবল একজন ব্যক্তির লড়াই নয়, বরং ইউরোপীয় রাজনীতির অসহিষ্ণুতা আর ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ বিভাজনের এক জীবন্ত দলিল।





