নিজস্ব প্রতিবেদন: চারদিকে ঢাকের শব্দ, হলদে শাড়ির ছোঁয়া আর কচি হাতের স্লেট-পেন্সিল। আজ সরস্বতী পুজো। হাতেখড়ির মধ্য দিয়ে অনেক শিশুরই আজ বিদ্যার জগতে প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু এই উৎসবের আবহেও কি আজ বিষাদের সুর মিশে নেই? এক বুক স্বপ্ন নিয়ে যে শিশুটি আজ বর্ণমালার সাথে পরিচিত হচ্ছে, তার বাবা-মায়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ। তাঁরা জানেন না, আগামী দিনে এই শিক্ষার খরচ জোগাতে পারবেন তো? নাকি মাঝপথেই থমকে যাবে সেই স্বপ্নযাত্রা?
শিক্ষা কি তবে কেবল পণ্য?
একটা সময় ছিল যখন শিক্ষা ছিল সাধনা, আর গুরুকুল ছিল পবিত্র। কিন্তু আজ? শিক্ষার আঙিনায় ঢুকে পড়েছে কর্পোরেট হাঙরের দল। নামী স্কুলের ‘ডোনেশন’ থেকে শুরু করে বাতানুকূল ক্লাসরুমের চড়া ফি— বিদ্যার দেবী যেন আজ কেবল সোনা-রুপোর সিংহাসনেই বন্দি।
বাবার মলিন মুখ: বাজারে যখন ডাল-ভাতের দাম জোগাতেই হিমশিম খেতে হয়, তখন সন্তানের হাতে দামি বিদেশি পাবলিকেশনের বই তুলে দেওয়া এক চরম বিলাসিতা। সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি দিয়ে অনেক শিশুই হয়তো প্রার্থনা করছে মস্ত বড় হওয়ার, কিন্তু তারা জানে না তাদের ঘিরে থাকা অর্থনৈতিক দেওয়ালটা কতটা উঁচু।
মেধার অপমৃত্যু: কত শত প্রতিভা আজ টিউশন ফি দিতে না পেরে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে। গ্রামের ধুলোমাখা মেঠো পথের সেই ছেলেটি, যার চোখে বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন, তার কাছে নামী কোচিং সেন্টারের দরজা চিরকালই বন্ধ। শিক্ষা আজ অধিকার নয়, বরং বহুমূল্য এক 'লাক্সারি' বা বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক অলীক জগতের হাতছানি
প্রতি বছর বাগদেবীর আরাধনা আসে, আমরা পুষ্পাঞ্জলি দিই। কিন্তু শিক্ষার এই চরম বাণিজ্যিকীকরণ সাধারণ মানুষের কাছে বিদ্যাকে এক 'অলীক কল্পনা' বা মরিচিকায় পরিণত করেছে। সাধারণ বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের উচ্চশিক্ষা মানেই আজ জমি বিক্রি অথবা ঘটি-বাটি বন্ধক রাখার নামান্তর। বিদ্যা অমূল্য ঠিকই, কিন্তু সেই বিদ্যা অর্জন করতে আজ যে মূল্য চুকাতে হচ্ছে, তা কি মানবিক?
"সরস্বতী মায়ের হাতে বই আর বীণা থাকে, কিন্তু আজকের দুনিয়ায় সেই বই কিনতে গেলেই তো পকেট গড়ের মাঠ। মা কি তবে কেবল ধনীদের ঘরেই আলো দেবেন?" — চোখের জল মুছে এমনটাই প্রশ্ন করলেন এক অসহায় শ্রমিক পিতা।
প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে— 'সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে...'। কিন্তু এই মন্ত্রের সুর যেন আজ চাপা পড়ে যাচ্ছে দামী ব্র্যান্ডের স্কুলের লিফলেট আর প্রস্পেক্টাসের খসখসানিতে। জ্ঞান যদি অর্থের মাপকাঠিতে কেনা-বেচা হয়, তবে সেই সমাজে বাগদেবীর আশীর্বাদ কি আদৌ বর্ষিত হয়?
আজকের দিনে আমাদের শপথ হোক— শিক্ষা যেন কোনো অলীক কল্পনা না হয়, বরং প্রতিটি শিশুর কাছে তা হয়ে ওঠে ভোরের নির্মল আলোর মতো সহজ এবং অবারিত।


