তেহরান, ১২ জানুয়ারি ২০২৬
আজকের সূর্য যেন এক বিভক্ত ইরানের সাক্ষী হয়ে উদিত হলো। তেহরানের আকাশ যখন ঘন কুয়াশায় ঢাকা, ঠিক তখনই ‘রেভোলিউশন স্কয়ারে’ নেমে এল হাজার হাজার মানুষের ঢল। হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সমর্থনে স্লোগান—রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত এই বিশাল সমাবেশ যেন এক উত্তাল সমুদ্রের রূপ নিল। তবে এই উৎসবের আবহের পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ক্ষত, যা গত দুই সপ্তাহ ধরে পুরো ইরানকে বিষাদগ্রস্ত করে রেখেছে।
সংহতির ডাক ও শোকের আবহ
সমাবেশে অংশ নেওয়া হাজারো মানুষের কণ্ঠে যেমন ছিল শাসকের প্রতি আনুগত্য, তেমনি ছিল সাম্প্রতিক বিক্ষোভে প্রাণ হারানো নিরাপত্তা কর্মীদের প্রতি গভীর শোক। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি এই সমাবেশকে "দাঙ্গাবাজ" এবং "বিদেশি হস্তক্ষেপের" বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক ঐক্যবদ্ধ জবাব হিসেবে বর্ণনা করেন। কিন্তু যখনই তিনি ‘শহীদ’ নিরাপত্তা কর্মীদের কথা বলছিলেন, জনতার মাঝে কান্নার রোল পড়ে যায়। এক বৃদ্ধাকে দেখা গেল তার নিহত ছেলের ছবি বুকে আঁকড়ে ধরে বিলাপ করতে; দেশাত্মবোধ আর ব্যক্তিগত শোক সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
মুদ্রার উল্টো পিঠ: জ্বলছে ক্ষোভের আগুন
যেখানে রেভোলিউশন স্কয়ারে সংহতির গান বাজছে, সেখান থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই ছড়িয়ে আছে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। গত ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের মূলে ছিল আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট আর অর্থনৈতিক হাহাকার। কিন্তু সেই পেটের দায় আজ রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নিয়েছে। উত্তর তেহরানের গলিগুলোতে এখনো কান পাতলে শোনা যায়—"একনায়কের মৃত্যু চাই" কিংবা "খামেনির পতন হোক"—এমন সব বিদ্রোহী স্লোগান।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই দুই সপ্তাহে অন্তত ৫০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কোথাও কোথাও মর্গে জায়গা না থাকায় মরদেহ হিমঘরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ইন্টারনেটের অন্ধকার গহ্বরে ঢাকা পড়ে আছে অসংখ্য মানুষের শেষ আর্তনাদ। স্টারলিংকের মাধ্যমে আসা ঝাপসা ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, লাইভ বুলেট আর টিয়ার গ্যাসের মুখে ছুটছে একদল তরুণ—যাদের চোখে স্বপ্ন নয়, বরং অদম্য এক জেদ।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি (১২ জানুয়ারি ২০২৬)
| বিষয় | বিবরণ |
| নিহতের সংখ্যা | মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে ৫০০+, সরকারি মতে শতাধিক নিরাপত্তা কর্মী। |
| গ্রেপ্তার | ১০,৬০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। |
| যোগাযোগ | দেশজুড়ে ইন্টারনেটে ব্ল্যাকআউট; কেবল স্টারলিংক ও স্যাটেলাইট আংশিক সচল। |
| আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া | ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি; জাতিসংঘ মহাসচিবের শোক ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান। |
বিভক্ত ইরান: কোন পথে ভবিষ্যৎ?
বিপ্লব চত্বরের এই জনসমুদ্রকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম "জনগণের সমর্থন" হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকদের দাবি অন্য। তারা বলছেন, সমাবেশে উপস্থিতদের বড় অংশই সরকারি চাকুরিজীবী এবং বাসিজ মিলিশিয়া সদস্য। সামাজিক মাধ্যমে (X) ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে—অনেকে মনে করছেন এগুলো পুরনো ফুটেজ।
দিনশেষে ইরানের আকাশ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগে রয়েছে রাষ্ট্রের সুরক্ষার শপথ, অন্যভাগে সাধারণ মানুষের বাঁচার অধিকারের লড়াই। রাত নামলেই তেহরানের আকাশে ভেসে আসে গুলির শব্দ আর জানলার আড়ালে থাকা পরিবারের আতঙ্কিত দীর্ঘশ্বাস। এই বিভাজন ইরানকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
"আমরা আমাদের সন্তানদের শান্তি দিতে চাই, যুদ্ধ নয়। কিন্তু রুটি যখন কেড়ে নেওয়া হয়, তখন মানুষ আর শান্ত থাকতে পারে না।"
— পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক তেহরান নিবাসী।




