নিজস্ব প্রতিবেদক, দুর্গাপুর | ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
দুর্গাপুরের শিল্পাঞ্চল আজ এক আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করল। ১ নং বিদ্যাসাগর এভিনিউ-এর সভামঞ্চ থেকে আজ যে হুঙ্কার ছাড়লেন শ্রমিকরা, তার প্রতিধ্বনি পৌঁছে গেল দিল্লি ও কলকাতার ক্ষমতার অলিন্দে। হিন্দুস্থান স্টীল এমপ্লয়ীজ ইউনিয়ন (HSEU)-এর এই কেন্দ্রীয় সমাবেশ কার্যত ১২ই ফেব্রুয়ারির সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘটকে এক ঐতিহাসিক রূপ দেওয়ার শপথ অনুষ্ঠানে পরিণত হলো।
ললিত মোহন মিশ্রের অগ্নিগর্ভ ভাষণ: "শ্রম কোড নয়, ওটা দাসের দলিল"
সিআইটিইউ (CITU)-এর কেন্দ্রীয় নেতা ললিত মোহন মিশ্র যখন মাইক্রোফোন ধরেন, তখন গোটা ময়দান নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তিনি তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতালব্ধ বক্তব্যে বর্তমান সরকারের শ্রমিক-বিরোধী নীতির ব্যবচ্ছেদ করেন। তাঁর বক্তৃতার প্রধান পয়েন্টগুলো ছিল:
লেবার কোড বনাম অধিকার: তিনি সাফ বলেন, "সরকার যে ৪টি লেবার কোড আনার কথা বলছে, তা আসলে শ্রমিকের রক্তে লেখা অধিকারগুলোকে মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। ৮ ঘণ্টার কাজকে ১২ ঘণ্টা করা, নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের অধিকার মালিকের হাতে তুলে দেওয়া—এসব আমরা জ্যান্ত থাকতে হতে দেব না।"
কর্পোরেট তোষণ: তিনি অভিযোগ করেন, "মোদী সরকার সাধারণ মানুষের পকেট কেটে আম্বানি-আদানিদের তিজোরি ভরছে। পিএফ-এর টাকা থেকে শুরু করে পেনশনের অধিকার—সবই আজ বিপন্ন।"
ধর্মঘটের অপরিহার্যতা: ১২ তারিখের ধর্মঘট কেন জীবন-মরণ লড়াই, তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "যদি এই ধর্মঘটে আমরা চাকা স্তব্ধ করতে না পারি, তবে আগামী দিনে আমাদের সন্তানদের জন্য কেবল দাসত্বই পড়ে থাকবে। তাই কারখানার গেটে গেটে ব্যারিকেড গড়ুন।"
আভাস রায় চৌধুরীর তাত্ত্বিক প্রহার ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
বিশিষ্ট তাত্ত্বিক নেতা আভাস রায় চৌধুরী নব্য উদারবাদের স্বরূপ উন্মোচন করেন। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছিল, আজ ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর ওপর সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ সেই একই দর্শনের ফসল। ভারতের ১১ বছরের 'নয়া ফ্যাসিবাদী' শাসন আসলে 'লুঠতরাজ পুঁজি'র (Looters' Capital) পাহারা দিচ্ছে মাত্র।
মাঠের লড়াইয়ে গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জি ও নেতৃত্বের সক্রিয়তা
বর্ষীয়ান নেতা গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জি সরাসরি লড়াইয়ের ময়দান থেকে শ্রমিকদের সংগঠিত করার ডাক দেন। তিনি বলেন, "আলোচনা আর চিঠিপত্র লেখার সময় শেষ। এখন সময় রাজপথে ফয়সালা করার।" সভার সভাপতি বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সীমান্ত চ্যাটার্জি স্পষ্ট জানান, দুর্গাপুরের ইস্পাত শ্রমিকরা বিএসপি বা ডিএসপি-র গেটে ১২ তারিখ ভোরে বিজয় নিশান ওড়াবেই। SESBF নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক 'প্রতারণা'র জবাব ধর্মঘটের মাধ্যমেই দেওয়া হবে।
কেন এই ১২ই ফেব্রুয়ারির সর্বভারতীয় ধর্মঘট?
এবারের ধর্মঘটের দাবিগুলো কেবল শ্রমিকদের নয়, বরং গোটা দেশের সাধারণ মানুষের:
শ্রম কোড বাতিল: ৪টি দাসত্বমূলক লেবার কোড অবিলম্বে প্রত্যাহার।
বিলগ্নীকরণ রোধ: রেল, বিমা, ইস্পাত ও কয়লা খাতের বেসরকারিকরণ বন্ধ করা।
নিরাপদ কর্মসংস্থান: ঠিকা প্রথার বিলোপ এবং শূন্যপদে স্থায়ী নিয়োগ।
মজুরি ও মহার্ঘ ভাতা: আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং পেনশনের গ্যারান্টি।
গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা: ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার ও প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা রক্ষা।
বিকেল গড়িয়ে রাত হলেও শ্রমিকের ভিড় কমেনি। সভার শেষে হাজারো মশাল আর মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটে এক মায়াবী কিন্তু লড়াকু পরিবেশ তৈরি হয়। "১২ই ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট সফল করুন", "ইনকিলাব জিন্দাবাদ" আর "লড়াই লড়াই লড়াই চাই" স্লোগানে প্রকম্পিত দুর্গাপুর আজ বুঝিয়ে দিল—শ্রমিক জাগলে দুনিয়া কাঁপে। ৯ তারিখের এই বিশাল প্রস্তুতি সভা ১২ তারিখের ধর্মঘটকে যে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যাবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।











