৮ মার্চ, ২০২৬ আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে। তবে এই দিবসের আড়ালে থাকা বৈপ্লবিক ইতিহাস এবং নারী অধিকারের লড়াই আজ নতুন করে আলোচনায় আসছে। বিশেষ করে ক্লারা জেটকিনের আহ্বান এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে নারীরা কীভাবে ভোটাধিকার ও সমান মজুরি অর্জন করেছিল, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপট ও ক্লারা জেটকিন
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সূচনা হয়েছিল মূলত শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রথম এই দিবসের প্রস্তাব করেন। তার সাথে ছিলেন প্রখ্যাত বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গ।
তৎকালীন সময়ে নারীদের ভোটাধিকার ছিল না, ছিল না শিক্ষার সুযোগ। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা দাবি তুলেছিলেন:
নারীদের ভোটাধিকার প্রদান।
পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করা।
অমানবিক কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নারী অধিকারের বিপ্লব
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েত সরকারই বিশ্বে প্রথম নারীদের পূর্ণাঙ্গ ভোটাধিকার এবং বৈতনিক মাতৃত্বকালীন ছুটি (Maternity Leave) নিশ্চিত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৯২০) এবং যুক্তরাজ্যের (১৯২৮) অনেক আগেই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৬৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ্যালেন্টিনা তেরেশকোভা বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশ জয় করে প্রমাণ করেছিলেন যে, সুযোগ পেলে নারীরা সব বাধা জয় করতে পারে।
মধ্য এশিয়ায় 'হুজুম' আন্দোলন ও মুক্তি
নারী দিবসের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৯২৭ সালের 'হুজুম' (Hujum) আন্দোলন। মধ্য এশিয়ায় সামন্ততান্ত্রিক প্রথা ভেঙে নারীদের পর্দা প্রথা থেকে বের করে আনা এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে এই আন্দোলন ছিল যুগান্তকারী। ১৯২৭ সালের ৮ মার্চ সমরকন্দের রেগিস্তান স্কয়ারে হাজার হাজার নারী তাদের মাথার আবরণ পুড়িয়ে মুক্তির শপথ নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে নারী দিবস ২০২৬-এর তাৎপর্য
বাংলাদেশেও এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের আমলে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও, সমান মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জগুলো এখনও রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি নারীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের প্রতীক। জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৭৫ সাল থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেলেও এর মূলে রয়েছে মেহনতি নারীদের দীর্ঘ লড়াই।
এক নজরে আন্তর্জাতিক নারী দিবস
| বিষয় | তথ্য |
| প্রথম প্রস্তাব | ১৯১০ (ক্লারা জেটকিন) |
| প্রথম আনুষ্ঠানিক উদযাপন | ১৯১১ |
| জাতিসংঘের স্বীকৃতি | ১৯৭৫ |
| মূল লক্ষ্য | সমঅধিকার, বৈষম্য বিলোপ ও নারীর ক্ষমতায়ন |
সমাজতন্ত্র না কি বর্বরতা?"—রোজা লুক্সেমবার্গের এই অমোঘ বাণী আজও প্রাসঙ্গিক। নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অধিকার কেউ দেয় না, অধিকার লড়াই করে আদায় করে নিতে হয়। ২০২৬ সালের এই দিনে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সকল নারীর জন্য একটি বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ গড়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।


