২০২৬ সালের শুরু থেকেই বিশ্ব রাজনীতি এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে তথাকথিত ‘শান্তি আলোচনা’র টেবিল সাজানো হয়েছে, অন্যদিকে ইরানের আকাশ ছেয়ে গেছে মার্কিন ও ইসরায়েলি মিসাইলের ধোঁয়ায়। কিন্তু এই যুদ্ধের ময়দান থেকে আসা তথ্যগুলো সাধারণ মানুষের মনে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এটি কি কেবলই একটি আদর্শিক যুদ্ধ, নাকি বিশ্ব অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা ব্যবসাকে নতুন করে সাজানোর বা ‘Global Economy Reset’-এর কোনো সুপরিকল্পিত নীল নকশা? যুদ্ধের আড়ালে যেভাবে রাশিয়ার তেলের মুনাফা বাড়ছে এবং প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারে ধস নামার বদলে উল্লম্ফন দেখা দিচ্ছে, তাতে এই প্রশ্নটি এখন সময়ের দাবি।
১. তথ্যের লড়াই ও ইন্টারনেটের ব্ল্যাকআউট: সত্যের মৃত্যু
যুদ্ধের প্রথম শিকার হলো ‘সত্য’। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি এক কথায় রহস্যময় ও অভূতপূর্ব। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানে প্রায় ৯৯% ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সাধারণ মানুষের কোনো ভিডিও বা তথ্য বাইরে আসছে না। কেবল রাষ্ট্রীয় নিউজ চ্যানেলগুলো যা দেখাচ্ছে, বিশ্বকে তাই বিশ্বাস করতে হচ্ছে।
এই চরম তথ্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই কিছু চাঞ্চল্যকর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হচ্ছে যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কয়েক স্তরের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন আয়রন ডোম ও প্যাট্রিয়ট) ভেদ করে সফল আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে, গুজব ছড়িয়েছে যে প্রবল বোমাবর্ষণের মধ্যেও ইরান অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ২০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন IAEA) এর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি। এই তথ্যের অভাবই প্রমাণ করে যে, যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়েও বড় লড়াই চলছে ‘পারসেপশন’ বা জনমত তৈরির ময়দানে।
২. মোজতবা খামেনির উত্থান ও নেতৃত্বের রহস্য
আয়তুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইরানের মতো দেশে যেখানে সামান্য সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুতে লাখো মানুষের জানাজা হয়, সেখানে খামেনির মতো নেতার কোনো বিশাল শোকযাত্রা (Funeral March) কেন দেখা গেল না?
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই গোপনীয়তা অবলম্বন করা হচ্ছে। আবার অন্য একটি অংশ বলছে, এটি একটি ‘পর্দার আড়ালের সমঝোতা’। যুদ্ধের ডামাডোলকে কাজে লাগিয়ে ইরানের ক্ষমতায় এই আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা দেশের ভেতরে কোনো বড় ধরণের বিক্ষোভ তৈরি হতে না পারে। ১০ দিনের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এই নেতৃত্ব পরিবর্তনকে নিষ্কণ্টক করার একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।
৩. গ্লোবাল ডিফেন্স বিজনেস স্পাইক: কার লাভ, কার ক্ষতি?
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় এবং প্রকাশ্য সুবিধাভোগী হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যুদ্ধের ঘোষণা আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারে প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারের দাম রকেটের গতিতে বাড়তে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি: Northrop Grumman, RTX (Raytheon) এবং Lockheed Martin-এর মতো কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম ৩০% থেকে ১১০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা খাত: ভারতের Paras Defence এবং HAL-এর মতো শেয়ারগুলোতেও ১০-১৮% প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
যুদ্ধের এই প্রেক্ষাপটকে বলা হচ্ছে ‘Global Defence Business Spike’। যুদ্ধের মাধ্যমে পুরোনো অস্ত্রের মজুদ শেষ করে নতুন প্রজন্মের এআই-চালিত অস্ত্র, ড্রোন এবং অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেমের জন্য ট্রিলিয়ন ডলারের একটি বাজার তৈরি করা হচ্ছে। অর্থাৎ, রণক্ষেত্রে রক্ত ঝরলেও ওয়াল স্ট্রিটের সিন্দুকগুলো ভরে উঠছে মুনাফায়।
৪. রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যে ‘গোল্ডেন এরা’
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো এই যুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকা। পশ্চিমা দেশগুলো যখন ইরানকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, তখন পরোক্ষভাবে রাশিয়ার অর্থনীতি লাভবান হচ্ছে।
তেল ও গ্যাসের মুনাফা: মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধের আতঙ্কে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় রাশিয়ার রপ্তানি আয় গত তিন বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিকল্প সরবরাহকারী: মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ এখন রাশিয়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। নিষেধাজ্ঞার কঠোর বেড়াজাল থাকা সত্ত্বেও ‘বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল’ নীতিতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
অনেকে একে দেখছেন এক অদ্ভুত ‘বিজনেস রিসেট’ হিসেবে। যেখানে এক দেশের যুদ্ধ অন্য দেশের (রাশিয়া) অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে তুলতে সাহায্য করছে।
৫. হরমুজ প্রণালী ও বৈশ্বিক অর্থনীতির রিসেট
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান বারবার এই প্রণালী বন্ধের হুমকি দিচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত কেবল কুয়েত সংলগ্ন এলাকায় কয়েকটি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে, কিন্তু এই ‘আতঙ্ক’ই বিশ্ব বাণিজ্যকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এই আতঙ্কের ফলেই বীমা কোম্পানিগুলো লজিস্টিক সার্ভিস চার্জ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বিশ্বজুড়ে নতুন ধরণের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা ‘Economic Reset’ করার চেষ্টা চলছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। যুদ্ধের ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়লেও কিছু বিশেষ গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্র এই সুযোগে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হচ্ছে।
৬. জেনেভার টেবিল বনাম রণক্ষেত্রের কামান
জেনেভায় যখন আলোচনার টেবিলে চা-কফি চলছে, তখন রণক্ষেত্রে কামানের গোলা ফাটছে। এই দ্বিমুখী নীতি আসলে বড় শক্তিগুলোর একটি পরিচিত কৌশল। একদিকে আলোচনার মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করা, অন্যদিকে সামরিক চাপের মাধ্যমে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র যদি সত্যিই মার্কিন প্রতিরক্ষা স্তর ভেদ করে থাকে, তবে তা আলোচনার টেবিলে ইরানের হাতকে শক্তিশালী করবে। আবার যদি ইরানের নিউক্লিয়ার সাইটগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তার শর্ত চাপিয়ে দেবে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ার শেষে যা অবশিষ্ট থাকবে, তা হলো একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নতুন এক বিশ্ব অর্থনীতি।
৭. এটি কি একটি সাজানো নাটক বা ‘স্টেজড শো’?
সব তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই যুদ্ধটি যতটা না সামরিক, তার চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত।
কেন কোনো বড় প্রতিরোধ নেই? ইরানের ভেতরে ইন্টারনেটের অনুপস্থিতিতে কী ঘটছে তা কেউ জানে না।
কেন রাশিয়ার ওপর কঠোরতা নেই? রাশিয়া যুদ্ধের মধ্যে থেকেও মুনাফা করছে, যা পশ্চিমাদের রাশিয়ার প্রতি নমনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
এই বিষয়গুলো থেকে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি একটি ‘Controlled Escalation’ বা নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা। অর্থাৎ যুদ্ধ ততটুকুই হবে যতটুকু হলে অস্ত্র ব্যবসা সচল থাকে এবং বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ এক হাত থেকে অন্য হাতে যায়।
ইরান-মার্কিন যুদ্ধ ২০২৬ কেবল দুটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আজ একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি মুনাফা, প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারের উল্লম্ফন এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের রহস্যময় পরিবর্তন—সবই একটি বড় ধরণের ‘গ্লোবাল রিসেট’-এর দিকে ইঙ্গিত করছে। সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি মানবিক বিপর্যয় হলেও, পর্দার আড়ালের খেলোয়াড়দের কাছে এটি একটি ট্রিলিয়ন ডলারের লাভজনক প্রজেক্ট। সত্য এবং মিথ্যার এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবে তা সময়ই বলে দেবে, তবে বিশ্ব যে আর আগের মতো থাকবে না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।


