তারিখ: ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
আগামীকাল ২৯ এপ্রিল ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ। নির্বাচন ঘিরে ডায়মন্ড হারবার বেল্টে রাজনৈতিক উত্তাপ এখন চরমে। একদিকে উত্তরপ্রদেশের 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' আইপিএস অফিসার অজয় পাল শর্মার বেনজির কড়া পদক্ষেপ, অন্যদিকে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের 'পুষ্পা' সুলভ হুঁশিয়ারি— সব মিলিয়ে ফলতায় এখন চূড়ান্ত নাট্যরূপ। কিন্তু শাসক ও প্রধান বিরোধী দলের এই প্রবল মেরুকরণের চেষ্টার মধ্যেই ফলতার মাটিতে নীরবে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ময়দান থেকে কংগ্রেস কার্যত 'মাইনাস' হয়ে যাওয়ায়, এই হাই-ভোল্টেজ নাটকের মধ্যেও সিপিআইএম (মার্কসবাদী) কৌশলগতভাবে এক সুবিধাজনক জায়গায় চলে এসেছে।
আইপিএস বনাম জাহাঙ্গীর: ফলতার মেগা ড্রামা
ভোটের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ফলতা সাক্ষী থেকেছে এক নজিরবিহীন পুলিশি তল্লাশির। ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ পেয়ে নির্বাচন কমিশনের পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয় পাল শর্মা এসএসবি এবং কিউআরটি (QRT) বাহিনী নিয়ে সোজা হানা দেন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের ডেরায়। জানা যায়, ভোটের ৩৬ ঘণ্টা আগেই এলাকা ছেড়েছেন প্রার্থী। শুধু তাই নয়, তাঁর বাড়িতে ওয়াই-ক্যাটাগরির ১০ জন নিরাপত্তারক্ষীর বদলে মোতায়েন ছিল ১৪ জন পুলিশ। এই ঘটনার পর ডায়মন্ড হারবারের অতিরিক্ত এসপি সহ ৫ জন স্থানীয় পুলিশ অফিসারকে সাসপেন্ড করে নির্বাচন কমিশন।
এর পাল্টা জবাব দিতে ছাড়েননি জাহাঙ্গীর খানও। তিনি সটান জানিয়ে দেন, "ও যদি সিঙ্গম হয়, তবে আমি পুষ্পা।" বিজেপি এই ঘটনাকে 'ভয় দেখানোর যুগের অবসান' বলে প্রচার করে হিন্দু ভোটের মেরুকরণ চাইছে, অন্যদিকে তৃণমূল একে 'কেন্দ্রীয় এজেন্সির দাদাগিরি' আখ্যা দিয়ে সংখ্যালঘু ভোট একজোট করার চেষ্টা করছে।
'মাইনাস কংগ্রেস' সমীকরণ: শাপে বর বামেদের
বিজেপি এবং তৃণমূল যখন নির্বাচনকে এই 'সিঙ্গম বনাম পুষ্পা' নাটকে আটকে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের বাইনারি তৈরি করতে চাইছে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে এর প্রভাব পড়ছে অন্যভাবে। রাজনৈতিক মহলের প্রাথমিক ধারণা ছিল, বাম-কংগ্রেস জোট না হওয়ায় বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ ভোট ভাগ হবে। কিন্তু ফলতায় কংগ্রেস প্রার্থীর উপস্থিতি ও প্রচার কার্যত নিষ্প্রভ।
যে সমস্ত সাধারণ মানুষ তৃণমূলের এই বিতর্ক ও বাহুবলী রাজনীতিতে ক্লান্ত এবং বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতিকে ভয় পান, তাঁদের কাছে কংগ্রেসের কোনো বিকল্প প্রভাব নেই। ফলে, ধর্মনিরপেক্ষ ও শান্তিপ্রিয় ভোটারদের ভোট সরাসরি সিপিআইএম (মার্কসবাদী) প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মীর ঝুলিতে এসে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই মেরুকরণের আবহে শক্তপোক্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বামেদের কাছে এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ।
জ্বলন্ত সমস্যা ও জনসভায় উপচে পড়া ভিড়
নাটক ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে বামেরা জোর দিচ্ছে এলাকার জ্বলন্ত সমস্যাগুলিতে। কর্মসংস্থান, শিল্প এবং সাধারণ মানুষের রুটিরুজির প্রশ্নে তাঁরা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। ফলতার বিভিন্ন এলাকায় আয়োজিত বামেদের প্রতিটি বড় জনসভা-তে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।
এই তীব্র মেরুকরণের মধ্যেও বাম শিবিরের নিচুতলার কর্মীরা একজোট হয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁদের একটাই বার্তা— রাজ্যে শান্তি ফেরাতে বামেদের কোনো বিকল্প নেই। এই আত্মবিশ্বাসে ভর করেই সাধারণ মানুষের কাছে একটাই আহ্বান পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে: হারানো অধিকার ফিরে পেতে "কাস্তে হাতুড়ি তাঁরা চিহ্নে ভোট দিয়ে জয়ী করুন"।
নির্বাচন কমিশনের কড়া পদক্ষেপ এবং আইপিএস ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিজেপি যে মেরুকরণের ঝড় তুলতে চেয়েছিল, তা কিছুটা হলেও ধাক্কা খাচ্ছে বামেদের এই নীরব ভোট একত্রীকরণের কাছে। ময়দানে কংগ্রেসের নিষ্ক্রিয়তা শম্ভুনাথ কুর্মীর জন্য এক বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। আগামীকাল ইভিএম-এ এই 'মাইনাস কংগ্রেস' সমীকরণ যদি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়, তবে প্রবল মেরুকরণের ফাঁদ এড়িয়ে ফলতায় সিপিআইএম (মার্কসবাদী) যে কোনো বড় চমক দিতে পারে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


