নিজস্ব প্রতিবেদন | ২২ এপ্রিল, ২০২৬
আজ ২২শে এপ্রিল। ক্যালেন্ডারের পাতায় আরও একটি বছর পেরিয়ে আজ বিশ্বের মেহনতি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা, সমাজতান্ত্রিক দর্শনের অন্যতম রূপকার এবং ঐতিহাসিক রুশ বিপ্লবের মহানায়ক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের ১৫৬তম জন্মদিবস। সারা বিশ্বের পাশাপাশি আজ রাজ্যেও গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে পালিত হচ্ছে এই দিনটি। শোষক শ্রেণির ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এই অবিসংবাদিত নেতার জন্মবার্ষিকীতে সারা দুনিয়ার বামপন্থী আন্দোলনের কর্মী ও সমর্থকরা তাঁকে স্মরণ করে লাল সেলাম জানাচ্ছেন।
এক অদম্য উত্থান ও ইতিহাসের পটপরিবর্তন
১৮৭০ সালের ২২শে এপ্রিল তৎকালীন রাশিয়ার সিমবির্স্ক শহরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ। সাইবেরিয়ার বুক চিরে বয়ে চলা বরফগলা 'লেনা' নদীর প্রবল স্রোতের মতোই অপ্রতিরোধ্য ছিল তাঁর চরিত্র; আর সেই নদীর নামানুসারেই ১৯০১ সালে তিনি গ্রহণ করেন তাঁর ঐতিহাসিক ছদ্মনাম—'লেনিন'।
জারতন্ত্রের ভয়াবহ শোষণ ও অত্যাচারে যখন রাশিয়ার সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন বিপর্যস্ত, তখন লেনিনই হয়ে উঠেছিলেন তাঁদের ত্রাতা। তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯১৭ সালের ঐতিহাসিক অক্টোবর বিপ্লবে রচিত হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস। পৃথিবীর বুকে প্রথমবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণির নিজস্ব রাষ্ট্র—সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯১৭ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়ার এবং ১৯২২ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রবর্তিত মার্কসবাদের বিকশিত রূপ, যা 'লেনিনবাদ' নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, আজও শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ হাতিয়ার।
আজকের দিনে প্রাসঙ্গিকতা: প্রজ্ঞার হাহাকার ও শৃঙ্খলমুক্তির লড়াই
বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেনিনের দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আজ যখন সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন আস্ফালন, যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের জাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন দিশেহারা, তখন লেনিনের মতাদর্শই পথ দেখায়।
শাসকের রূঢ় রাজদণ্ডের নিচে সাধারণ মানুষের শৃঙ্খলিত স্বপ্নগুলো যখন বারবার হোঁচট খাচ্ছে, তখন লেনিনের লড়াই মনে করিয়ে দেয় যে—অধিকার কেউ করুণা করে দেয় না, তা সংঘবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে আনতে হয়। পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের যে নিখুঁত বিশ্লেষণ তিনি করেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীর এই চরম অস্থিরতার যুগেও তা ধ্রুব সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ ও শিল্পশহরে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি
সারা বিশ্বের পাশাপাশি আজ পশ্চিমবঙ্গেও এই দিনটি বিশেষ সম্মানের সঙ্গে পালিত হচ্ছে। সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনের উদ্যোগে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে লেনিনের মূর্তি ও প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।
পিছিয়ে নেই পশ্চিম বর্ধমান জেলাও। আজ সকাল থেকেই শিল্পশহর দুর্গাপুর এবং আসানসোল শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে দলীয় কার্যালয় ও শ্রমিক সংগঠনগুলির উদ্যোগে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। দুর্গাপুরের ইস্পাত নগরী থেকে শুরু করে কয়লাঞ্চল—সর্বত্রই মেহনতি মানুষ ও বামপন্থী কর্মীরা লাল পতাকার নিচে সমবেত হয়ে মহামতি লেনিনের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। উপস্থিত নেতৃত্ব আজকের দিনে দাঁড়িয়ে শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ওপর জোর দেন।
অনন্ত স্পর্ধার অমরত্ব
মাত্র ৫৩ বছর বয়সে, ১৯২৪ সালের ২১শে জানুয়ারি মস্কোর নিকটে গর্কি-তে এই মহান নেতার জীবনাবসান হয়। কিন্তু লেনিন তো কেবল রক্তমাংসের কোনো মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অনন্ত স্পর্ধা। তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর আদর্শের কোনো মৃত্যু নেই। যতদিন পৃথিবীতে শোষণ থাকবে, বৈষম্য থাকবে, ততদিন লেনিন বেঁচে থাকবেন কোটি কোটি শোষিত মানুষের হৃদয়ে, লড়াইয়ের ময়দানে, স্লোগানে আর মুক্তির গানে।
আজ তাঁর ১৫৬তম জন্মবার্ষিকীতে বিশ্বজুড়ে একটাই আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—কমরেড লেনিন, লাল সেলাম!


