২০২৬ সালের এপ্রিলে জবলপুরের বারগি বাঁধে মর্মান্তিক ক্রুজ ডুবিতে ৯ জন পর্যটকের মৃত্যু আবারও এক রূঢ় বাস্তবকে সামনে এনেছে: ভারতের জলপথে পর্যটন ব্যবস্থা চরম অবহেলার শিকার। প্রশাসন সাধারণত দুর্ঘটনার পর তদন্তের নির্দেশ দিলেও, গত এক দশকের নৌ-দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, এগুলো নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এগুলো হলো প্রাথমিক সুরক্ষা বিধি লঙ্ঘনের ফলে সৃষ্ট প্রতিরোধযোগ্য এক একটি বিপর্যয়।
ভারতে নৌ-দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো কী এবং পর্যটকদের সুরক্ষায় কী কী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, তা নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
জবলপুর বারগি বাঁধের দুর্ঘটনা: একটি প্রতিরোধযোগ্য বিপর্যয়
গত ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে জবলপুরের কাছে নর্মদা নদীর ব্যাকওয়াটারে রাজ্য পর্যটন দপ্তরের পরিচালিত একটি ক্রুজ প্রবল ঝড়ে উল্টে যায়। ৬০-৭০ কিমি প্রতি ঘণ্টা বেগের ঝড় জাহাজটিকে ডুবিয়ে দিলেও, আসল ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির মধ্যে:
তালাবন্ধ লাইফ জ্যাকেট: যাত্রীদের ওঠার আগে কোনো লাইফ জ্যাকেট পরানো হয়নি। জাহাজ ডুবতে শুরু করলে স্টোররুম থেকে তাড়াহুড়ো করে লাইফ জ্যাকেট বের করা হয়, যার ফলে চরম আতঙ্ক ছড়ায়।
আবহাওয়ার সতর্কতা উপেক্ষা: আবহাওয়া দপ্তরের তরফ থেকে ঝড়ের 'অরেঞ্জ অ্যালার্ট' থাকা সত্ত্বেও ক্রুজটিকে ঘাট ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
কর্মীর অভাব: বিপদের সময় ৩০ জনের বেশি যাত্রীকে সামলানোর জন্য জাহাজে মাত্র দুজন কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
ভারতে নৌকা দুর্ঘটনার ৪টি প্রধান কারণ
জবলপুরের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৩ সালের কেরালার তানুর দুর্ঘটনা হোক বা ২০১৯ সালের অন্ধ্রপ্রদেশের গোদাবরী বিপর্যয়—সব ক্ষেত্রেই ৪টি সাধারণ সুরক্ষা বিধি লঙ্ঘনের চিত্র ফুটে ওঠে:
১. লাইফ জ্যাকেটের অভাব বা দেরিতে বিতরণ
প্রায় প্রতিটি বড় নৌ-দুর্ঘটনাতেই দেখা যায়, জাহাজে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট থাকে না অথবা যাত্রীদের সুবিধার অজুহাতে সেগুলো স্টোররুমে তালাবন্ধ করে রাখা হয়। নিয়ম হলো, নৌকায় পা রাখার আগেই যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক।
২. বিপজ্জনকভাবে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানো
মুনাফার লোভে নিরাপত্তার সাথে আপস করা হয়। নৌযানগুলোতে অনুমোদিত ক্ষমতার দ্বিগুণ বা তিনগুণ যাত্রী ওঠানো ভারতে একটি সাধারণ ঘটনা। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৪ সালে ওড়িশার হিরাকুদ বাঁধে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি (প্রায় ১১৫ জন) যাত্রী তোলায় নৌকা ডুবে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
৩. আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ভ্রূক্ষেপ না করা
জবলপুরের ঘটনার মতোই, অপারেটররা প্রায়ই সরকারি আবহাওয়ার সতর্কতা উপেক্ষা করে থাকেন। নদীর জলস্তর বাড়ুক বা ঝড়ের পূর্বাভাস থাকুক—টিকিটের টাকা হারানোর ভয়ে অপারেটররা পর্যটকদের জীবন নিয়ে মারাত্মক ঝুঁকি নেন।
৪. লাইসেন্সবিহীন ও আনফিট নৌযান
ভিতরের জলপথগুলোতে চলাচলকারী অনেক নৌযানেরই কোনো কাঠামোগত ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে পুরনো মাছ ধরার নৌকাকে বেআইনিভাবে দোতলা ট্যুরিস্ট ফেরিতে পরিণত করা হয়, যার কোনো স্ট্যাবিলিটি টেস্টিং থাকে না।
ভারতে কি নৌ-নিরাপত্তা আইন আছে?
হ্যাঁ। ঔপনিবেশিক আমলের আইনের বদলে ভারত সরকার 'ইনল্যান্ড ভেসেলস অ্যাক্ট, ২০২১' (Inland Vessels Act, 2021) প্রণয়ন করেছে, যা জলপথে সুরক্ষার একটি জাতীয় রূপরেখা তৈরি করেছে। এই আইনের প্রধান দিকগুলো হলো:
জাহাজের ১০০% যাত্রী ও ক্রুদের জন্য জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম রাখা বাধ্যতামূলক।
নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিত করা জাহাজের মাস্টারের আইনি দায়িত্ব।
অতিরিক্ত যাত্রী বহনের জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান।
সমস্যা কোথায়?
সমস্যা হলো আইনের প্রয়োগে। এই আইনে প্রথমবার অপরাধের জন্য মাত্র ১০,০০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এত সামান্য জরিমানা অপারেটরদের মধ্যে কোনো ভীতি তৈরি করতে পারে না।
কীভাবে এই ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব?
জবলপুর, তানুর বা গোদাবরীর মতো মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে:
বোর্ডিংয়ের আগে বাধ্যতামূলক চেকিং: "লাইফ জ্যাকেট ছাড়া বোর্ডিং নয়"—এই নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং ঘাটে পুলিশ বা পর্যটন আধিকারিকদের দিয়ে তা যাচাই করতে হবে।
ডিজিটাল ওয়েদার ইন্টারলকিং: টিকিট বুকিং সিস্টেমকে সরাসরি আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কবার্তার সাথে যুক্ত করতে হবে। 'অরেঞ্জ' বা 'রেড অ্যালার্ট' থাকলে টিকিট বিক্রি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত।
কঠোর আইনি পদক্ষেপ: গাফিলতির কারণে মৃত্যু হলে নামমাত্র জরিমানার বদলে অপারেটরদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু করতে হবে।
থার্ড-পার্টি অডিট: রাজ্য সরকারের পরিচালিত পর্যটন জাহাজগুলোর নিরাপত্তা যাচাই করার জন্য নিরপেক্ষ থার্ড-পার্টি অডিটের ব্যবস্থা করতে হবে।
জবলপুরের ক্রুজ দুর্ঘটনা এক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ভারতের জলপথে পর্যটন শিল্পে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। শুধুমাত্র খাতায়-কলমে আইন থাকলেই হবে না, তার কঠোর প্রয়োগই পারে নির্দোষ পর্যটকদের প্রাণ বাঁচাতে।


