নয়াদিল্লি: রান্নাঘর থেকে পরিবহণ, কৃষিক্ষেত্র থেকে ছোট ব্যবসা— পেট্রোল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত আজ দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের উপর। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার খরচ যখন লাগামছাড়া, তখনই সামনে আসছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির বিপুল আয়ের হিসাব। আর সেই পরিসংখ্যান ঘিরেই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ও কর কাঠামো নিয়ে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, Indian Oil Corporation ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে প্রায় ₹৮.৪৫ লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব অর্জন করেছে। একইভাবে Oil India Limited-এর আয়ও কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আবহেও ভারতীয় তেল সংস্থাগুলির এই বিপুল আয় এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
“দাম বাড়লে লাভ কার?”— প্রশ্ন বিরোধীদের
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও দেশের বাজারে সেই সুফল সাধারণ মানুষ পান না। বরং কেন্দ্রীয় সরকার আবগারি শুল্ক ও বিভিন্ন করের মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব সংগ্রহ করছে।
সমালোচকদের দাবি, সাধারণ মানুষ যখন প্রতি লিটার পেট্রোল-ডিজেলের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছেন, তখন সেই অর্থের একটি বড় অংশ কর হিসেবে সরকারের কোষাগারে যাচ্ছে এবং তেল সংস্থাগুলির মুনাফাও বাড়ছে। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধির চাপ বইছেন সাধারণ নাগরিক, কিন্তু লাভের অংশীদার মূলত সরকার ও কর্পোরেট সংস্থাগুলি।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের বক্তব্য, ভারতের জ্বালানি নীতি এখন অনেকটাই “রেভিনিউ-ড্রিভেন” বা রাজস্ব নির্ভর। কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ের একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে জ্বালানি কর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সেই হারে দেশীয় বাজারে মূল্য কমানোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা অনেক সময় দেখা যায় না।
ভারত কীভাবে তেল রপ্তানি করে?
অনেকেরই প্রশ্ন— যখন দেশে জ্বালানির দাম এত বেশি, তখন ভারত কীভাবে তেল রপ্তানি করছে?
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, ভারত মূলত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। সেই তেল বিভিন্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, এভিয়েশন ফুয়েল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়। এরপর সেই পরিশোধিত জ্বালানির একটি বড় অংশ বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
অর্থাৎ ভারত “ক্রুড অয়েল এক্সপোর্টার” নয়, বরং “রিফাইন্ড ফুয়েল এক্সপোর্টার”। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানির দাম বাড়ে, তখন ভারতীয় রিফাইনারিগুলি বেশি লাভে বিদেশে জ্বালানি বিক্রি করতে পারে।
২০২৪ সালে ভারত প্রায় ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের মিনারেল ফুয়েল ও তেলজাত পণ্য রপ্তানি করেছে বলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত তথ্যসূত্রে জানা গিয়েছে।
“দেশের মানুষের আগে বিদেশ?”— উঠছে বিতর্ক
সমালোচকদের অভিযোগ, দেশের বাজারে জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার রপ্তানি আয়ের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক তেল সংকটের সময়েও ভারতীয় রিফাইনারিগুলি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিদেশে পাঠিয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা।
তাদের বক্তব্য, “যখন সাধারণ মানুষ উচ্চ দামে জ্বালানি কিনতে বাধ্য, তখন বিদেশে জ্বালানি রপ্তানি করে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা কি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য?”
কেন্দ্র অবশ্য দাবি করে, রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করলে দেশের রিফাইনারি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের অবস্থান দুর্বল হবে। পাশাপাশি সরকার মাঝে মধ্যে রপ্তানি শুল্ক আরোপ করে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে বলেও কেন্দ্রের বক্তব্য।
মূল্যবৃদ্ধির চক্রে সাধারণ মানুষ
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহণ খরচের উপর। তার ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ে। কৃষিক্ষেত্রে ডিজেলের খরচ বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ছোট ব্যবসায়ী, ট্রাক চালক, অ্যাপ ক্যাব চালক থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবার— প্রায় সবাই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অনুভব করছেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার একদিকে “উন্নয়ন” ও “অর্থনৈতিক বৃদ্ধির” কথা বললেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। জ্বালানির দামকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই চাপ মূল্যস্ফীতিকেও বাড়িয়ে তুলছে।
রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে জ্বালানি
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী দিনে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বড় নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কারণ পেট্রোল-ডিজেলের দাম এমন একটি বিষয়, যা প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত।
বিরোধী শিবির ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে— “যদি তেল সংস্থাগুলির আয় এতটাই বাড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানির দাম কমছে না কেন?”
এই প্রশ্নই এখন দেশের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।


