কলকাতা, ৪ মে ২০২৬: আজ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা চলছে। প্রাথমিক ট্রেন্ড অনুযায়ী, বামফ্রন্ট এবং তাদের সহযোগী দলগুলো অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াইয়ের সম্মুখীন হয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, বাম-প্রগতিশীল জোট মাত্র ২ থেকে ৩টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শূন্য হয়ে যাওয়ার পর, এবার বামেদের মূল লক্ষ্য ছিল বিধানসভায় অন্তত 'খাতা খোলা' বা খরা কাটানো। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) দ্বিমেরু রাজনীতিতে সেই লক্ষ্য পূরণও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং বলে মনে হচ্ছে।
জোট সমীকরণ এবং প্রার্থী বিভাজন
২০২১ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধলেও, ২০২৬-এ কংগ্রেসের সঙ্গে বামেদের কোনো জোট হয়নি। এর ফলে বাম এবং কংগ্রেসের ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে। তবে, বামফ্রন্ট এবার ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (ISF) এবং CPI(ML) লিবারেশনের সঙ্গে একটি বৃহত্তর বাম-প্রগতিশীল জোট গঠন করেছে।
মোট প্রায় ২৯০টি আসনে এই জোট প্রার্থী দিয়েছে, যার মধ্যে আসন বিভাজন নিম্নরূপ:
বামফ্রন্ট (Left Front): ২৫২টি আসন (এর মধ্যে CPI(M) একাই লড়ছে ১৭০টি আসনে)।
ISF (ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট): ২৯-৩০টি আসন।
CPI(ML) লিবারেশন: ৮টি আসন।
বামফ্রন্টের অন্দরে দলভিত্তিক প্রার্থী সংখ্যা:
CPI(M): ১৭০
AIFB (ফরোয়ার্ড ব্লক): ২১
CPI: ১৭
RSP: ১৪
RCPI: ১
MFB: ১
হেভিওয়েট প্রার্থী এবং প্রচারের মূল ইস্যু
এবার বামফ্রন্ট তাদের প্রচারের মুখ হিসেবে তরুণ প্রজন্মকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলা একাধিক ইস্যুকে তারা হাতিয়ার করেছিল।
উল্লেখযোগ্য প্রার্থীরা হলেন:
মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় (CPI(M) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য) — উত্তরপাড়া কেন্দ্র থেকে লড়ছেন।
বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য (প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ ও বর্ষীয়ান আইনজীবী) — যাদবপুর কেন্দ্র থেকে লড়ছেন।
নওসাদ সিদ্দিকি (ISF প্রধান) — ভাঙড় কেন্দ্র থেকে লড়ছেন। ভাঙড়ে তাঁর এগিয়ে থাকার খবরই জোটের জন্য এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা।
প্রচারের মূল হাতিয়ার:
বামফ্রন্ট মূলত তিনটি বড় ইস্যুকে সামনে রেখে ময়দানে নেমেছিল—
১. SIR বিতর্ক: ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ।
২. দুর্নীতি: রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি।
৩. আর জি কর (RG Kar) কাণ্ড: চিকিৎসা ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া বিতর্কিত ঘটনা।
বাম পতনের ঐতিহাসিক খতিয়ান
একসময় ৩৪ বছর রাজ্য শাসন করা বামফ্রন্টের এই পতন একদিনে হয়নি। ২০০৬ সালে যেখানে CPI(M) একাই ১৭৬টি আসন পেয়েছিল এবং ভোট শেয়ার ছিল ৩৭%-এর বেশি, সেখানে ২০২১ সালে তারা একটিও আসন পায়নি।
| নির্বাচন | প্রাপ্ত আসন | আনুমানিক ভোট শেয়ার |
| ২০১১ | ৬২ | ~৪০% |
| ২০১৬ | ৩২ | ~২৬% |
| ২০১৯ (লোকসভা) | ২ | ৬.২৮% |
| ২০২১ | ০ | ৩.১% |
| ২০২৪ (লোকসভা) | ০ | — |
| ২০২৬ (বর্তমান ট্রেন্ড) | ২-৩ (এগিয়ে) | — |
কেন এই অব্যাহত পতন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বামেদের এই শোচনীয় অবস্থার পিছনে একাধিক কারণ দায়ী:
দ্বিমেরু রাজনীতি (Bipolar Politics): রাজ্যে তৃণমূল বনাম বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি এতটাই তীব্র যে, বাম ভোটারদের একটি বড় অংশ কৌশলগতভাবে (Strategic voting) এই দুই দলের কোনো একটিকে ভোট দিচ্ছেন।
কংগ্রেসের সাথে জোট না হওয়া: বিরোধী ভোট এককাট্টা না হওয়ায় এবং কংগ্রেসের সাথে জোট না থাকায় প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট ভাগ হয়েছে।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ (SIR): অভিযোগ, SIR-এর মাধ্যমে রাজ্যের ৯১ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ সংখ্যালঘু এবং গরিব মানুষ, যাঁরা ঐতিহাসিকভাবে বামফ্রন্টের বড় ভোটব্যাঙ্ক ছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতি:
এই মুহূর্তে সরকার গঠন অনেক দূরের কথা, বামফ্রন্টের প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য হলো বিধানসভায় ফের নিজেদের প্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনা এবং তলানিতে ঠেকা ভোট শেয়ার কিছুটা হলেও বৃদ্ধি করা। ভোট গণনার চূড়ান্ত ফলাফলই বলে দেবে তারা সেই লক্ষ্যে কতটুকু সফল হতে পারল।


