ভারতবর্ষের ইতিহাসে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা কেবল নিজেদের সময়কে নয়, বরং অনাগত ভবিষ্যৎকেও আলোকিত করে যান। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে, যখন গোটা ভারত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং ধর্মান্ধতার অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন এক অকুতোভয় সূর্যোদয়ের মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তাঁকে কেবল 'সমাজ সংস্কারক' বললে তাঁর বিশালত্বকে খাটো করা হয়; তিনি ছিলেন আধুনিক ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা, এক নির্ভীক যুগনায়ক, যাঁর যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তাধারাই পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক সুদৃঢ় ও অলঙ্ঘনীয় বৌদ্ধিক ভিত গড়ে দিয়েছিল।
রাজনৈতিক পরাধীনতার চেয়ে মানসিক পরাধীনতা যে অনেক বেশি ভয়ংকর—এই ধ্রুব সত্যটি ভারতবর্ষের বুকে প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন রামমোহন। তিনি বুঝেছিলেন, যে সমাজ কুসংস্কারের শেকলে বন্দি, সে সমাজ কখনো স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।
মানসিক স্বাধীনতার প্রথম উদ্গাতা
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হাতে যেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভাঙার লড়াই শুরু হয়েছিল, তার বহু দশক আগে রামমোহন রায় শুরু করেছিলেন ভারতীয় সমাজের নিজস্ব শৃঙ্খল ভাঙার লড়াই।
মানবিক অধিকারের প্রথম প্রবক্তা: সতীদাহ প্রথার মতো এক চরম অমানবিক ও নিষ্ঠুর প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই কেবল একটি প্রথা রদ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল নারীমুক্তি এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম সার্থক আন্দোলন। নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, কট্টরপন্থীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ধর্মের নামে কোনো অমানবিকতা চলতে পারে না।
সমতার সমাজ গঠন: ব্রাহ্ম সমাজের মাধ্যমে তিনি জাতিভেদ প্রথা এবং পৌত্তলিকতার মূলে আঘাত হানেন। তাঁর এই লড়াই সমাজকে বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এক সর্বজনীন ও সমানাধিকার ভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সংবিধানের অন্যতম মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
প্রগতিশীল শিক্ষার আলোকবর্তিকা
রামমোহন রায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো ভারতীয়দের আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করার দূরদর্শিতা। যখন দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রাচীন ধ্যানধারণায় আচ্ছন্ন, তখন তিনি আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন আধুনিক বিজ্ঞানের আলো।
১৮২৩ সালে লর্ড আমহার্স্টকে লেখা তাঁর সেই ঐতিহাসিক চিঠিটি কেবল একটি আবেদনপত্র ছিল না; সেটি ছিল একটি ঘুমন্ত জাতির জেগে ওঠার ইস্তাহার। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে, ভারতকে যদি বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, তবে সংস্কৃত টোলের বদলে প্রয়োজন আধুনিক গণিত, রসায়ন, অ্যানাটমি এবং দর্শনের শিক্ষা। তাঁর এই সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির ফসল হিসেবেই ভারতে ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটে, যা জন্ম দেয় এক আধুনিক শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের। এই তরুণেরাই পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব প্রদান করেছিল।
মুক্তবাক ও অধিকার আদায়ের প্রথম লড়াই
স্বাধীনতা মানে কেবল ভৌগোলিক মুক্তি নয়, স্বাধীনতা মানে মতপ্রকাশের অধিকার। এই অধিকার আদায়ের প্রথম লড়াইটি করেছিলেন রামমোহন রায়।
তাঁর সম্পাদিত 'সংবাদ কৌমুদী' (বাংলা) এবং 'মিরাত-উল-আখবর' (ফার্সি) পত্রিকাগুলো কেবল খবর পরিবেশন করত না, সেগুলো ছিল পরাধীন ভারতের প্রথম নির্ভীক কণ্ঠস্বর। ব্রিটিশ সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর সওয়াল, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিল। তিনি শাসন ও বিচার বিভাগকে আলাদা করার দাবি তুলেছিলেন, যা প্রমাণ করে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা কতটা পরিণত ও আধুনিক ছিল।
এক কালজয়ী উত্তরাধিকার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে যথার্থই "ভারতপথিক" বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। রামমোহন রায় সেই দুর্গম পথের যাত্রী ছিলেন, যে পথ ধরে পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু বা জওহরলাল নেহরুর মতো নেতারা ভারতের স্বাধীনতার রথকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
তাঁর যুক্তিবাদী দর্শন, আধুনিক শিক্ষার প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং সামাজিক ন্যায়ের জন্য আপসহীন সংগ্রাম—ভারতবর্ষের আত্মাকে এক নতুন আয়নায় দাঁড় করিয়েছিল। তিনি কেবল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েননি, তিনি লড়েছিলেন ভারতের নিজের ভেতরের অন্ধকারের বিরুদ্ধে। আজ আমরা যে স্বাধীন, ধর্মান্ধতামুক্ত, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক ভারতের স্বপ্ন দেখি, তার প্রথম রূপরেখাটি নিজের হাতে এঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়।
আধুনিক ভারতের এই মহান রূপকারের প্রতি গোটা জাতি চিরকাল বিনম্র শ্রদ্ধায় ও গভীর ঋণে আবদ্ধ থাকবে।



