স্পোর্টস ডেস্ক: বহু দশকের যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সংকটের ইতিহাস বহন করে চলা ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) এবার বিশ্বমঞ্চে লিখল এক নতুন অধ্যায়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ জায়গা নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার দেশটি।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরুটা অবশ্য কঙ্গোর পক্ষে ছিল না। ম্যাচের ১০ মিনিটেই অধিনায়ক এলদোর শোমুরোদভের গোলে এগিয়ে যায় উজবেকিস্তান। প্রথমার্ধে বলের দখল, রক্ষণ সংগঠন এবং পাল্টা আক্রমণে মধ্য এশিয়ার দলটিকেই বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল।
কিন্তু বিরতির পর যেন সম্পূর্ণ বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।
ডিআর কঙ্গো আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। মাঝমাঠে গতি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলে তারা। সেই চাপের ফল আসে দ্রুত। দলের হয়ে জোড়া গোল করেন ইয়োনে উইসা, আর একটি গোল করেন ফিস্টন মায়েলে। দ্বিতীয়ার্ধে কঙ্গোর ধারাবাহিক আক্রমণের সামনে উজবেকিস্তান কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে।
পরিসংখ্যানও কঙ্গোর আধিপত্যেরই প্রমাণ দেয়। পুরো ম্যাচে তাদের Expected Goals (xG) ছিল ২.৩৫, যেখানে উজবেকিস্তানের xG মাত্র ০.২৮। গোলের সুযোগ তৈরি, আক্রমণের কার্যকারিতা এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই দ্বিতীয়ার্ধে কঙ্গো ছিল স্পষ্টভাবে এগিয়ে।
সংগ্রামের দেশের ফুটবল
ডিআর কঙ্গোর এই জয় শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্য নয়, বহু মানুষের কাছে এটি আশা ও প্রতিরোধের প্রতীক।
বিশ্বের অন্যতম খনিজ-সমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ডিআর কঙ্গো দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিদেশি হস্তক্ষেপ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ এবং মানবিক সংকটে জর্জরিত। বিশেষ করে দেশের পূর্বাঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘর্ষে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
বিশ্বকাপ চলাকালেও কঙ্গোর সমর্থকদের একটি অংশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রতীকী প্রতিবাদে অংশ নেন। তাদের বক্তব্য ছিল, বিশ্বের বড় বড় সংবাদমাধ্যম ফুটবলের উচ্ছ্বাস দেখালেও পূর্ব কঙ্গোর মানবিক বিপর্যয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
এই প্রেক্ষাপটে ডিআর কঙ্গোর ফুটবলারদের সাফল্য দেশটির সাধারণ মানুষের কাছে কেবল একটি জয় নয়; বরং কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিক শক্তির প্রতিফলন।
দ্বিতীয়ার্ধেই বদলে যায় ম্যাচ
প্রথমার্ধে উজবেকিস্তান পরিকল্পিত ফুটবল খেললেও বিরতির পর কঙ্গোর দ্রুতগতির ট্রানজিশন, উইং ব্যবহার এবং আক্রমণাত্মক প্রেসিং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইয়োনে উইসা ছিলেন ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়। তাঁর দুটি গোলই উজবেকিস্তানের রক্ষণভাগকে ভেঙে দেয়। ফিস্টন মায়েলের গোল নিশ্চিত করে ঐতিহাসিক জয়।
আফ্রিকান ফুটবলের আরেকটি গর্বের মুহূর্ত
২০২৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকার দলগুলির ধারাবাহিক উন্নতির আরেকটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠল ডিআর কঙ্গো। শক্তিশালী ও সংগঠিত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে দলটি ফিরে এসেছে, তা বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন কঙ্গোর ফুটবলার ও সমর্থকেরা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পৌঁছে তারা শুধু একটি ম্যাচ জেতেনি—সংগ্রাম, আশা এবং আত্মবিশ্বাসের এক নতুন গল্পও লিখেছে।






