ভিউজ নাও স্পোর্টস ডেস্ক: ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ফুটবলপ্রেমীরা সাক্ষী থাকলেন টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় অঘটনের। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি নাটকীয় লড়াইয়ের শেষে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিল, আর দুর্দান্ত মানসিক দৃঢ়তা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল উপহার দিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা নিশ্চিত করল প্যারাগুয়ে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচের ফল ছিল ১-১। এরপর পেনাল্টি শুটআটেই নির্ধারিত হয় ম্যাচের ভাগ্য।
শুরু থেকেই আক্রমণ–প্রতিআক্রমণের লড়াই
ম্যাচের শুরু থেকেই জার্মানি বলের দখল নিজেদের কাছে রাখার চেষ্টা করে। মাঝমাঠে ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, জামাল মুসিয়ালা এবং কাই হাভার্টজের সমন্বয়ে একের পর এক আক্রমণ গড়ে ওঠে। তবে প্যারাগুয়ের রক্ষণ ছিল অসাধারণ সংগঠিত। অধিনায়কের নেতৃত্বে ডিফেন্স বারবার জার্মান আক্রমণ প্রতিহত করে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠে।
প্রথম ২০ মিনিটেই জার্মানি কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি করলেও শেষ মুহূর্তে ফিনিশিংয়ের অভাব এবং প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের দুর্দান্ত সেভ তাদের এগিয়ে যেতে দেয়নি। অন্যদিকে প্যারাগুয়ে ধৈর্য ধরে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে থাকে।
এনসিসোর হেডে এগিয়ে প্যারাগুয়ে
৪২তম মিনিটে আসে ম্যাচের প্রথম বড় মুহূর্ত। ডান প্রান্ত থেকে মাতিয়াস গালারসার নিখুঁত ক্রস জার্মান ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে পৌঁছে যায় হুলিও এনসিসোর কাছে। দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে প্যারাগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার সমর্থক আনন্দে ফেটে পড়েন, আর জার্মান শিবিরে নেমে আসে চাপ।
প্রথমার্ধের শেষ পর্যন্ত প্যারাগুয়ে সেই ব্যবধান ধরে রেখে বিরতিতে যায়।
বিরতির পর বদলে যায় ম্যাচের গতি
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই জার্মানি আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। দ্রুত পাস, উইং ব্যবহার এবং উচ্চ প্রেসিংয়ের মাধ্যমে তারা প্যারাগুয়ের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
৫৩তম মিনিটে সেই চেষ্টার ফল আসে। ফ্লোরিয়ান ভির্টজের নিখুঁত ক্রস থেকে কাই হাভার্টজ শক্তিশালী হেডে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। গোলের পর জার্মান খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং তারা জয়ের গোলের খোঁজে আরও মরিয়া হয়ে ওঠে।
একের পর এক সুযোগ, কিন্তু গোল আর নয়
সমতা ফেরানোর পর ম্যাচ আরও দ্রুতগতির হয়ে ওঠে। দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে। জার্মানি একাধিক কর্নার ও ফ্রি-কিক পেলেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। অন্যদিকে প্যারাগুয়ে পাল্টা আক্রমণে জার্মান রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে।
নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
VAR বদলে দিল ম্যাচের মোড়
অতিরিক্ত সময়ে মনে হয়েছিল জার্মানি অবশেষে জয়ের গোল পেয়ে গেছে। কর্নার থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে জোনাথন তাহ বল জালে পাঠান। জার্মান সমর্থকেরা উদযাপন শুরু করলেও VAR পর্যালোচনার পর রেফারি জানান, গোল হওয়ার আগে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের ওপর ফাউল হয়েছিল।
ফলে গোল বাতিল হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্তে জার্মান খেলোয়াড়রা হতাশ হলেও রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। ম্যাচ শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে গড়ায়।
টাইব্রেকারের রুদ্ধশ্বাস নাটক
পেনাল্টি শুটআট শুরু হতেই নাটকীয়তা আরও বাড়ে। জার্মানির প্রথম শট নেন কাই হাভার্টজ, কিন্তু সেটি রুখে দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক। এরপর আরও দুটি পেনাল্টি নষ্ট করে জার্মানি।
অন্যদিকে প্যারাগুয়েও দুটি সুযোগ হাতছাড়া করলেও তারা চাপের মুহূর্তে নিজেদের স্নায়ু নিয়ন্ত্রণে রাখে। শেষ পর্যন্ত হোসে কানালে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শেষ পেনাল্টি জালে জড়িয়ে দেন। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-৩, আর সেই সঙ্গে শুরু হয় প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক উদযাপন।
ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়
বিশ্বকাপের ইতিহাসে টাইব্রেকারে এর আগে কখনও হারেনি জার্মানি। সেই গর্বের রেকর্ড ভেঙে দিল প্যারাগুয়ে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় করে তারা শুধু শেষ ষোলোয় ওঠেনি, বরং পুরো ফুটবল বিশ্বকে জানিয়ে দিল যে এই বিশ্বকাপে কোনো দলকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এই জয় প্যারাগুয়ের ফুটবল ইতিহাসেও অন্যতম স্মরণীয় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। দলগত ঐক্য, দুর্দান্ত রক্ষণ, গোলরক্ষকের অসাধারণ পারফরম্যান্স এবং মানসিক দৃঢ়তাই তাদের এই অবিশ্বাস্য জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়।
জার্মানির জন্য বড় ধাক্কা
জার্মানির জন্য এই পরাজয় নিঃসন্দেহে বড় আত্মসমালোচনার বিষয়। বলের দখল, আক্রমণের সংখ্যা এবং সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে থেকেও তারা ম্যাচ জিততে পারেনি। বিশেষ করে পেনাল্টি শুটআটে অভিজ্ঞ দলের এমন ব্যর্থতা সমর্থকদের হতাশ করেছে।
ম্যাচের সারসংক্ষেপ
ম্যাচ: জার্মানি বনাম প্যারাগুয়ে
প্রতিযোগিতা: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬, রাউন্ড অব ৩২
নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়: জার্মানি ১-১ প্যারাগুয়ে
গোল: হুলিও এনসিসো (৪২'), কাই হাভার্টজ (৫৩')
টাইব্রেকার: প্যারাগুয়ে ৪-৩ জার্মানি
নায়ক: হোসে কানালে (জয়সূচক পেনাল্টি)
টার্নিং পয়েন্ট: VAR-এ জোনাথন তাহের গোল বাতিল এবং জার্মানির তিনটি পেনাল্টি মিস।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই ম্যাচ দীর্ঘদিন মনে রাখবেন ফুটবলপ্রেমীরা। কারণ এটি শুধু একটি জয় বা পরাজয়ের গল্প নয়—এটি বিশ্বাস, সাহস, শৃঙ্খলা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। প্যারাগুয়ে প্রমাণ করে দিল, ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।










