ভিউজ নাও ডেস্ক | ৩০ জুন, ২০২৬
আজ ৩০ জুন। ভারতীয় উপমহাদেশের শোষণবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে এক অমর দিন। আজ হুল দিবস—১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৭১তম বার্ষিকী। এই দিন শুধু একটি বিদ্রোহের স্মৃতি নয়; এটি হাজার হাজার আদিবাসী মানুষের আত্মত্যাগ, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
সাঁওতালি ভাষায় "হুল" শব্দের অর্থ বিদ্রোহ, বিপ্লব বা শোষণের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন বর্তমান ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক ভোগনাডিহ গ্রামে হাজার হাজার সাঁওতাল মানুষের সমাবেশে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন চার ভাই—সিধু মুর্মু, কানহু মুর্মু, চাঁদ মুর্মু এবং ভৈরব মুর্মু। তাঁদের সেই আহ্বান মুহূর্তের মধ্যেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র সাঁওতাল পরগনা জুড়ে।
এটি ছিল এমন এক বিদ্রোহ, যা শুধু ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধেই নয়; জমিদার, মহাজন, দালাল এবং শোষণের সমগ্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল সাধারণ মানুষের সংগঠিত বিস্ফোরণ।
কেন বিদ্রোহে ফেটে পড়েছিল সাঁওতাল সমাজ?
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন অঞ্চলে এনে কৃষিকাজে নিয়োজিত করা হয়। কঠোর পরিশ্রমে তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষের জমি তৈরি করলেও সেই জমির ওপর তাদের অধিকার ক্রমশ কেড়ে নেওয়া হয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের রাজস্বনীতি, জমিদারদের অত্যাচার, মহাজনদের অস্বাভাবিক সুদ, ঋণের ফাঁদ, জোরপূর্বক জমি দখল এবং প্রশাসনের উদাসীনতা সাঁওতাল সমাজকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। দিনরাত পরিশ্রম করেও তারা ঋণমুক্ত হতে পারত না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শোষণের শিকার হতে হতে তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
অভিযোগ জানিয়েও যখন কোনো বিচার মেলেনি, তখনই জন্ম নেয় সশস্ত্র প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত।
৩০ জুন ১৮৫৫: ইতিহাস বদলে দেওয়া সেই দিন
ভোগনাডিহ গ্রামের বিশাল সমাবেশে সিধু ও কানহু ঘোষণা করেন যে ব্রিটিশ শাসন আর মানা হবে না। হাজার হাজার মানুষ শপথ নেন নিজেদের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করবেন।
ধনুক, তীর, টাঙ্গি, বল্লম, কুড়াল ও দেশীয় অস্ত্র হাতে কৃষক, শ্রমজীবী এবং আদিবাসীরা সংগঠিত হতে শুরু করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই বিদ্রোহ বিস্তৃত হয় বর্তমান ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিস্তীর্ণ এলাকায়।
ব্রিটিশ প্রশাসনের বহু থানায় আক্রমণ হয়। জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রুখে দাঁড়ায়। সাময়িকভাবে বহু এলাকায় ব্রিটিশ প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল।
ব্রিটিশদের নির্মম দমননীতি
সাঁওতাল হুল ব্রিটিশ শাসকদের আতঙ্কিত করে তোলে। বিদ্রোহ দমন করতে সেনাবাহিনী নামানো হয়। আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও কামানের সামনে ধনুক-তীর নিয়ে লড়াই করেও অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন সাঁওতাল যোদ্ধারা।
গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, নির্বিচারে গুলি চালানো হয়, অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, এই সংগ্রামে প্রায় ২০ হাজার সাঁওতাল শহিদ হন। সিধু ও কানহু শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়ে শহিদ হন। কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আগুন নিভতে দেয়নি।
নারীরা ছিলেন সংগ্রামের অগ্রসৈনিক
সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসে নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। ফুলো মুর্মু ও ঝানো মুর্মু শুধু প্রতীকী চরিত্র নন; তাঁরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, বিদ্রোহীদের সংগঠিত করেছেন এবং বহু যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এছাড়াও অসংখ্য আদিবাসী নারী খাদ্য সরবরাহ, আশ্রয়, বার্তা আদান-প্রদান, আহতদের সেবা এবং প্রতিরোধ সংগঠনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে সাঁওতাল হুল শুধুমাত্র পুরুষদের যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল সমগ্র সমাজের সম্মিলিত গণআন্দোলন।
১৮৫৭-এর আগেই স্বাধীনতার অগ্নিশিখা
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কথা বেশি আলোচিত হলেও, তার দুই বছর আগেই সাঁওতাল হুল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটি ছিল ভারতের অন্যতম বৃহৎ সংগঠিত আদিবাসী গণঅভ্যুত্থান এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম দিকের সশস্ত্র প্রতিরোধগুলির একটি। এই বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
বাংলার ইতিহাসেও অমলিন এই অধ্যায়
সাঁওতাল পরগনা একসময় বৃহত্তর বাংলার প্রশাসনিক অংশ ছিল। তাই পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং সংলগ্ন অঞ্চলের ইতিহাসেও হুল বিদ্রোহের গভীর ছাপ রয়েছে।
আজও পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় শহিদ স্মরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা এবং পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে হুল দিবস পালন করা হয়। সিধু-কানহু, চাঁদ-ভৈরব, ফুলো-ঝানোর নাম নতুন প্রজন্মের কাছে সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবে উচ্চারিত হয়।
আজকের দিনে হুল দিবসের বার্তা
হুল দিবস শুধু অতীতের একটি স্মরণোৎসব নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্যায়, বৈষম্য, জমি কেড়ে নেওয়া, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি।
১৭১ বছর আগে যে সংগ্রামের আগুন ভোগনাডিহে জ্বলে উঠেছিল, তার আলো আজও ন্যায়, সমতা, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে অনুপ্রাণিত করে।
হুল দিবসে বীর সিধু-কানহু, চাঁদ-ভৈরব, ফুলো-ঝানো এবং সাঁওতাল বিদ্রোহের সকল অজানা শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁদের আত্মত্যাগ ভারতবর্ষের সংগ্রামের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।


