স্পোর্টস ডেস্ক | ভিউজ নাও | ১৭ জুন, ২০২৬
বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসি মানেই রেকর্ড, বিস্ময় এবং ফুটবল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে মুগ্ধ করে চলা এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জে’-তে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে ৩-০ গোলের জয়ে একাই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন মেসি। শুধু তাই নয়, ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক করে তিনি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নিজের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছেন।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জন্য এটি ছিল বিশ্বকাপ মিশনের প্রথম ম্যাচ। প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া দীর্ঘদিন পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে এলেও শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল দুই দলের মানের পার্থক্য কতটা। আর সেই পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে তুললেন লিওনেল মেসি।
শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার আধিপত্য
ম্যাচের প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সমন্বয় আলজেরিয়াকে কার্যত খেলায় ফিরতে দেয়নি। অন্যদিকে আক্রমণভাগে লাউতারো মার্টিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজের উপস্থিতি আলজেরিয়ার রক্ষণকে ক্রমাগত চাপে রাখে।
পরিসংখ্যানও আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দেয়। পুরো ম্যাচে তারা ৯টি শট নেয়, যার মধ্যে ৬টি ছিল অন-টার্গেট। ৪৬১টি সফল পাস এবং ৯১ শতাংশ পাসিং নির্ভুলতা আর্জেন্টিনার খেলার মানকে তুলে ধরে। বল দখলের লড়াইয়ে দুই দল প্রায় সমান থাকলেও কার্যকর ফুটবলের দিক থেকে আর্জেন্টিনা ছিল অনেক এগিয়ে।
অন্যদিকে আলজেরিয়া ৫টি শট নিলেও একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। আর্জেন্টিনার সুসংগঠিত রক্ষণ এবং এমিলিয়ানো মার্টিনেজের নেতৃত্বে ডিফেন্স লাইন তাদের কোনো সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি।
মেসির জাদুতে ভেঙে পড়ল আলজেরিয়া
ম্যাচের ১৭তম মিনিটে প্রথম গোলটি আসে মেসির পা থেকে। মাঝমাঠ থেকে তৈরি হওয়া এক দারুণ আক্রমণে বল পেয়ে বক্সের ভেতরে ঠাণ্ডা মাথায় ফিনিশ করেন তিনি। গোলটি ছিল অভিজ্ঞতা, সময়জ্ঞান এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের এক অনবদ্য উদাহরণ।
প্রথম গোলের পরও থেমে থাকেননি মেসি। দ্বিতীয়ার্ধে তিনি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। ৬০তম মিনিটে দ্রুতগতির এক আক্রমণ থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন। এরপর ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক। আর সেই হ্যাটট্রিকই তাঁকে নিয়ে গেল নতুন এক উচ্চতায়।
১৫ গোলের মাইলফলক: এক দীর্ঘ যাত্রার সাফল্য
বিশ্বকাপে মেসির মোট গোল সংখ্যা এখন ১৫। এই অর্জন কোনো একক টুর্নামেন্টের সাফল্য নয়; এটি ২০ বছরের অধ্যবসায়, ধারাবাহিকতা এবং অসাধারণ প্রতিভার ফল।
২০০৬ সালে জার্মানিতে প্রথম বিশ্বকাপে অভিষেক হয় তাঁর। সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করেছিলেন। এরপর ২০১০ সালে গোল না পেলেও দলের অন্যতম সৃষ্টিশীল খেলোয়াড় ছিলেন তিনি।
২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন। ২০১৮ সালে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর অসাধারণ গোল আজও বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে তিনি যেন নিজের শ্রেষ্ঠ সংস্করণে ফিরে আসেন। সাত গোল করে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতানোর নায়ক হন। আর ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে গোলসংখ্যা ১৫-তে নিয়ে যান।
কিংবদন্তিদের পাশে মেসি
এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে মেসি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় যৌথ দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন।
বর্তমান তালিকা:
১. মিরোস্লাভ ক্লোসে (জার্মানি) – ১৬ গোল
২. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) – ১৫ গোল
২. রোনাল্ডো নাজারিও (ব্রাজিল) – ১৫ গোল
৪. গার্ড মুলার (জার্মানি) – ১৪ গোল
অর্থাৎ আর মাত্র একটি গোল করলেই মেসি স্পর্শ করবেন ক্লোসের রেকর্ড। আর দুটি গোল করলেই এককভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবেন।
ছয় বিশ্বকাপের বিস্ময়
মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অর্জনগুলোর একটি হলো ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ। আরও অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, তিনি ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপেই গোল করেছেন।
ফুটবল ইতিহাসে এমন কীর্তি আর কোনো খেলোয়াড়ের নেই। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল করে মেসি সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছেন।
এই কৃতিত্ব শুধু দীর্ঘ ক্যারিয়ারের নয়; এটি ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক।
গোলদাতা থেকে স্থপতি
মেসির ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি সময়ের সঙ্গে নিজেকে অসাধারণভাবে বদলে নিয়েছেন।
২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত গতিনির্ভর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। ড্রিবলিং, স্পিড এবং ব্যক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ভেঙে ফেলতেন।
কিন্তু ২০২২ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে দেখা গেছে ভিন্ন এক মেসিকে। এখন তিনি খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন, ফাঁকা জায়গা তৈরি করেন, সতীর্থদের সুযোগ করে দেন এবং প্রয়োজনীয় মুহূর্তে গোল করেন।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও দেখা গেছে, তিনি খুব বেশি দৌড়াননি। বরং সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় উপস্থিত হয়ে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছেন।
এটাই একজন মহান ফুটবলারের বিবর্তন।
আর্জেন্টিনার শিরোপা রক্ষার বার্তা
২০২২ সালে কাতারে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, মেসিকে ছাড়া ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনা কতটা শক্তিশালী থাকবে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই দলটি বুঝিয়ে দিয়েছে যে তারা এখনও অন্যতম শিরোপা দাবিদার।
স্কালোনির দল আক্রমণ, মাঝমাঠ এবং রক্ষণ— তিন বিভাগেই ভারসাম্যপূর্ণ। আর সামনে যখন লিওনেল মেসির মতো একজন নেতা আছেন, তখন যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই আর্জেন্টিনা বড় হুমকি।
সামনে আরও ইতিহাস?
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ শেষেই ফুটবল বিশ্বে এখন একটাই আলোচনা— মেসি কি মিরোস্লাভ ক্লোসের রেকর্ড ভাঙতে পারবেন?
যদি বর্তমান ফর্ম বজায় থাকে, তাহলে সেই সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। আর্জেন্টিনার সামনে এখনও গ্রুপ পর্বের একাধিক ম্যাচ রয়েছে, এরপর নকআউট পর্বও।
অর্থাৎ ইতিহাস গড়ার জন্য সময় এবং সুযোগ— দুটোই রয়েছে তাঁর হাতে।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে এই ম্যাচটি হয়তো বিশ্বকাপের একটি গ্রুপ ম্যাচ মাত্র। কিন্তু লিওনেল মেসির জন্য এটি ছিল আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। হ্যাটট্রিক, ১৫ গোলের মাইলফলক, বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা গোলদাতার রেকর্ডের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া— সব মিলিয়ে এটি এমন একটি রাত, যা ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
৩৯ বছর বয়সেও তিনি প্রমাণ করে চলেছেন যে প্রতিভা, পরিশ্রম এবং ফুটবল বুদ্ধিমত্তার কোনো বিকল্প নেই। আর তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে যখনই লিওনেল মেসি নামেন, তখন শুধু একটি ম্যাচ নয়— রচিত হয় একটি নতুন ইতিহাস।






