নয়াদিল্লি, ১০ জুন: দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে দেশজুড়ে আলোচিত নিউজ পোর্টাল NewsClick-কে ঘিরে আইনি লড়াইয়ে বড় মোড় এনে দিল দিল্লি হাইকোর্ট। নিউজক্লিকের প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ এবং সংস্থার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দিল্লি পুলিশের ইকোনমিক অফেন্সেস উইং (EOW)-এর এফআইআর এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর ECIR খারিজ করে দিয়েছে আদালত। মামলার ধারাবাহিকতাকে আদালত “আইনের চরম অপব্যবহার” বা gross abuse of law বলে উল্লেখ করেছে।
দিল্লি হাইকোর্টের এই রায়কে শুধু প্রবীর পুরকায়স্থ বা নিউজক্লিকের জন্য নয়, দেশের স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমগুলির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি অর্থায়ন, আর্থিক অনিয়ম এবং রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তদন্তের মুখে থাকা নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলির ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে আদালত।
কী ছিল অভিযোগ?
২০২০ সালে দিল্লি পুলিশের ইকোনমিক অফেন্সেস উইং একটি এফআইআর দায়ের করে অভিযোগ তোলে যে নিউজক্লিক বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে সন্দেহজনক উপায়ে বিপুল অর্থ গ্রহণ করেছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি ছিল, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং শেয়ারের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখিয়ে অর্থ আনা হয়েছে।
পরবর্তীতে এই অভিযোগের ভিত্তিতেই ইডি মানি লন্ডারিংয়ের মামলা শুরু করে। ২০২১ সালে নিউজক্লিকের দপ্তর এবং সংস্থার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সাংবাদিক ও কর্মীর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। সেই সময় থেকেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সরকারের সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বর দমনের অভিযোগ এবং তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়।
ইউএপিএ মামলার সূত্রপাত
২০২৩ সালের অক্টোবরে মামলাটি আরও নাটকীয় মোড় নেয় যখন দিল্লি পুলিশ বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (UAPA)-এর অধীনে প্রবীর পুরকায়স্থ এবং নিউজক্লিকের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান অমিত চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ করা হয় যে বিদেশি অর্থ ব্যবহার করে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কার্যকলাপ চালানো হয়েছে।
মামলায় ইউএপিএ-র ১৩, ১৬, ১৭, ১৮ এবং ২২সি ধারার পাশাপাশি ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩এ (সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগ) এবং ১২০বি (অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র) ধারাও প্রয়োগ করা হয়। কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ-র আওতায় মামলা হওয়ায় বিষয়টি জাতীয় স্তরে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ
২০২৪ সালের ১৫ মে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত প্রবীর পুরকায়স্থের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডকে বেআইনি বলে ঘোষণা করে। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ করা হয়নি এবং আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এর ফলে প্রবীর পুরকায়স্থ জামিনে মুক্তি পান এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
দিল্লি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
সাম্প্রতিক রায়ে দিল্লি হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে যে বিদেশি বিনিয়োগ ও শেয়ার লেনদেন সংক্রান্ত যে অভিযোগগুলি আনা হয়েছিল, তা থেকে কোনও ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ মেলে না। আদালতের মতে, সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ সেই সময়কার নীতিমালার আওতায় অনুমোদিত ছিল এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলি অপরাধমূলক অভিসন্ধি বা বেআইনি আর্থিক কার্যকলাপের যথেষ্ট প্রমাণ আদালতের সামনে তুলে ধরতে পারেনি।
আদালত আরও মন্তব্য করে যে শুধুমাত্র অনুমান বা সন্দেহের ভিত্তিতে কোনও ব্যক্তি বা সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে ফৌজদারি মামলা চালিয়ে যাওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। সেই কারণেই এফআইআর এবং ইডি-র ECIR উভয়ই বাতিল করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক
নিউজক্লিক মামলাটি শুরু থেকেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রের তদন্ত ক্ষমতার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বারবার অভিযোগ করেছেন যে সরকারের সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশের কারণে নিউজক্লিককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি ছিল, জাতীয় নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বচ্ছতার স্বার্থে তদন্ত করা হয়েছে।
দিল্লি হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে সেই বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আইনি মহলের একাংশের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ফৌজদারি মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের অবসান
প্রায় ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার, আদালত-পর্ব এবং রাজনৈতিক বিতর্কের পর অবশেষে প্রবীর পুরকায়স্থ ও নিউজক্লিক বড় আইনি স্বস্তি পেল। দিল্লি হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি মামলার পরিসমাপ্তিই নয়, বরং গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা, তদন্তকারী সংস্থার জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে চলমান জাতীয় আলোচনাকেও নতুন মাত্রা দিল।


