নিজস্ব সংবাদদাতা | কলকাতা | ২৫ জুন
দক্ষিণ কলকাতার তারাতলা শিল্পাঞ্চলে নির্মীয়মাণ একটি গোডাউন ধসে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর টানা দ্বিতীয় দিনেও অব্যাহত রয়েছে উদ্ধার অভিযান। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল ১১টা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮ জনে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ৩১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
উদ্ধারকারী বাহিনীর দাবি, এখনও ধ্বংসস্তূপের নীচে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই কঠিন হয়ে উঠছে উদ্ধার অভিযান। ভারী কংক্রিটের স্ল্যাব, লোহার বিম এবং ধসে পড়া কাঠামোর কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবুও জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, দমকল, কলকাতা পুলিশ এবং সিভিল ডিফেন্সের যৌথ বাহিনী দিনরাত এক করে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
ভোরে জীবিত উদ্ধার এক শ্রমিক
বৃহস্পতিবার ভোরে উদ্ধারকারী বাহিনী ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে এক শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই উদ্ধার অভিযানের ফলে ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও জীবিত শ্রমিক থাকার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ায় উদ্ধারকারী দল আরও সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলের বাইরে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছেন। অনেকেই এখনও তাঁদের স্বজনদের কোনও খোঁজ পাননি। প্রশাসনের তরফে মৃত ও আহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার কাজও চলছে।
দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী দল
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, নির্মীয়মাণ গোডাউনের কাঠামো নির্মাণের সময় একাধিক নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ভবনের ভারবহন ক্ষমতা, নির্মাণ সামগ্রীর মান এবং প্রকৌশলগত ত্রুটি—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মান নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
গ্রেফতার ৫, SIT গঠন
ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই ৫ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন—
- শম্ভুনাথ বেহরা — গোডাউনের মালিক। বুধবার গভীর রাতে তাঁর ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
- কমল সামন্ত — স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার।
- সৈয়দ মহম্মদ গুলজার — নির্মাণ সুপারভাইজার।
- মহম্মদ আতাউল — ঠিকাদার।
- সুভাষ সরকার — ঠিকাদার।
ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১০ (অনিচ্ছাকৃত খুন), ১১ (অনিচ্ছাকৃত খুনের চেষ্টা) এবং ৩(৫) (অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তকারীরা নির্মাণ সংক্রান্ত নথি, অনুমোদনের কাগজপত্র, নকশা, স্ট্রাকচারাল রিপোর্ট এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করছেন। প্রয়োজন হলে আরও গ্রেফতার হতে পারে বলেও তদন্তকারী সূত্রের ইঙ্গিত।
রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা তীব্র হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারী বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় বিধানসভায় ক্ষতিপূরণ, উদ্ধার অভিযান এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে।
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে অনুমোদিত সমস্ত নির্মাণ প্রকল্পের বিশেষ অডিট করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। প্রশাসনের দাবি, কোথাও নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন বা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে গোডাউনের প্রোমোটার আসগর হুসেন-এর মৃত্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বেআইনি নির্মাণ ও প্রশাসনিক গাফিলতির ফলেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি
দুর্ঘটনার পর নিহত শ্রমিকদের পরিবার এবং আহতদের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, উন্নত চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের দাবি জোরালো হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলিও নির্মাণ শিল্পে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে কার্যকর করা, দোষীদের দ্রুত শাস্তি এবং শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি
বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। ভারী ক্রেন, হাইড্রোলিক কাটার এবং বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করে ধাপে ধাপে কংক্রিটের স্তূপ সরানো হচ্ছে। উদ্ধারকারী বাহিনীর মতে, ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা মাথায় রেখেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
তারাতলার এই বিপর্যয় শুধু একটি নির্মাণ দুর্ঘটনা নয়, বরং শিল্পাঞ্চলে নির্মাণ নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নজরদারি এবং শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি এবং উদ্ধার অভিযানের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য।


