ভূমিকার প্রেক্ষাপট: নিশীথ রাতের সেই ছদ্মবেশী অভিযাত্রী
১৯৩২ সাল। নিশিরাতের নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন চট্টগ্রামের রাজপথ। পুরুষবেশে ছদ্মাবৃত এক তরুণী নিঃশব্দে পরিচালনা করছেন ‘রেকি’ বা গোপন সামরিক সমীক্ষা। মাস্টারদা সূর্য সেনের এই বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার হৃদস্পন্দনে তখন ব্যক্তিগত ভয়ের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তিমূলে করাঘাত করার এক সুতীব্র সংকল্প। ১৯৩০-এর দশকের রক্ষণশীল বাংলায় কল্পনা দত্তের এই দুঃসাহসিক বিচরণ কেবল সমকালীন লিঙ্গীয় সামাজিক কাঠামোকেই চূর্ণ করেনি, বরং ঔপনিবেশিক শাসনের পুরুষতান্ত্রিক দর্পের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ চপেটাঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। একজন মেধাবী রসায়ন ও গণিতের ছাত্রীর এই সশস্ত্র সক্রিয়তা ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরের কাছে ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তবে কল্পনা দত্তের ইতিহাস কেবল একটি আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর প্রকৃত ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এক গভীরতর বৌদ্ধিক বিবর্তনে—যেখানে সশস্ত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক বীরত্ব রূপান্তরিত হয়েছিল সুসংগঠিত গণ-আন্দোলনের দর্শনে। রিভলভারের সেই স্ফুলিঙ্গ একসময় পরিণত হয়েছিল শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির মশালরূপে।
প্রথম পর্যায়: বিপ্লবের অগ্নিপরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক বিদ্রোহ
বিংশ শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকে বাংলার ছাত্র রাজনীতি ছিল সশস্ত্র বৈপ্লবিক চেতনার প্রসূতিগৃহ। কলকাতার বেথুন কলেজ তখন কেবল উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তের মতো বিপ্লবীদের গোপন সংহতির পাদদেশ। কল্পনা দত্তের ভূমিকা ছিল সমকালীন অন্য নারী বিপ্লবীদের তুলনায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কেবল বার্তাবাহক বা সহযোগী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বিপ্লবের ‘কারিগরি প্রকৌশলী’। রসায়নের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে ব্যবহার করে সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড এবং ‘৩ পাউন্ড আরসি পাউন্ড’ (3 lbs RC pound) বিস্ফোরকের সংমিশ্রণে শক্তিশালী মাইন ও বোমা তৈরিতে তাঁর পারদর্শিতা ছিল বিস্ময়কর। এই ‘বৈজ্ঞানিক বিদ্রোহ’ প্রমাণ করেছিল যে, ভারতের মুক্তি সংগ্রামে নারীরা কেবল আদর্শিক অনুপ্রেরণা নয়, বরং তাঁরা ছিলেন ঔপনিবেশিক পরিকাঠামো ধ্বংসের প্রধান কারিগর। বেথুন কলেজ ও চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের মধ্যে যে কৌশলগত সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল, কল্পনা ছিলেন তার অন্যতম মধ্যমণি। ১৯৩২ সালে পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব অভিযানের প্রাক্কালে তাঁর গ্রেপ্তার এই অদম্য যাত্রায় এক সাময়িক ছেদ টেনে দিলেও ব্রিটিশ রাজের প্রতি তাঁর অবজ্ঞা ছিল অবিচল।
মতাদর্শগত রূপান্তর: কারাগার থেকে গণমুখী মার্ক্সবাদ
১৯৩৩ থেকে ১৯৩৯ সালের দীর্ঘ কারাজীবন কল্পনা দত্তের জীবনে এক অনন্য বৌদ্ধিক প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে কাজ করে। ব্রিটিশ জেলগুলো তখন ছিল রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য ‘অনভিপ্রেত বিশ্ববিদ্যালয়’। সেখানে গঠিত ‘কমিউনিস্ট কনসোলিডেশন’-এর পাঠচক্রে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের প্রগাঢ় অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করেন যে, মুষ্টিমেয় তরুণের বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র আক্রমণ বা ‘ভ্যানগার্ডইজম’ (Vanguardism)-এর মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল বিশ্বশক্তিকে চিরতরে উৎখাত করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত বীরত্ববাদের সীমাবদ্ধতা এবং সংগঠিত গণসংগ্রামের অপরিহার্যতা নিয়ে তাঁর এই নির্মোহ বিশ্লেষণ ছিল তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ১৯৩৯ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে (সিপিআই) যোগদান ছিল কোনো সাময়িক আবেগ নয়, বরং দীর্ঘ গবেষণালব্ধ এক সুসংহত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাঁর কাছে মার্ক্সবাদ ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের এমন এক টেকসই কাঠামো, যেখানে শ্রমিক-কৃষক ও আপামর জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণই ছিল শোষণের অবসান ঘটানোর একমাত্র পথ।
গণআন্দোলন ও উত্তরাধিকার: বিপ্লবীর এক বহুমাত্রিক পরিচিতি
কারাগার থেকে মুক্তির পর কল্পনা দত্তের রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র আর গোপন আস্তানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৪৩ সালে পিসি জোশীর সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে গণসংগঠনের কাজে সঁপে দেন। বিশেষ করে ১৯৪৩-এর ভয়াবহ মন্বন্তরের সময় আর্তমানবতার সেবায় তাঁর ত্রাণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার নেতৃত্ব ছিল এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারীদের স্মৃতিকথা’ (Chittagong Armoury Raiders: Reminiscences) বিপ্লবীদের আত্মত্যাগকে এক নির্মোহ ঐতিহাসিক ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রামের আসন থেকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের এক নতুন অধ্যায়। ইতিহাস অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁকে কেবল ‘অস্ত্রধারী অগ্নিকন্যা’ হিসেবে মনে রাখলেও, পরবর্তী জীবনে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে (ISI) তাঁর কাজ এবং পরিসংখ্যানের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নের লড়াই অনেক সময়ই আড়ালে পড়ে যায়। তাঁর এই রূপান্তর—বিপ্লবী থেকে পরিসংখ্যানবিদ এবং সংগঠক হয়ে ওঠা—প্রমাণ করে যে তাঁর লড়াই ছিল সামাজিক সাম্য ও প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম।
সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা: সংগ্রামের নবতর ব্লু-প্রিন্ট
আজকের বিশ্ব পরিস্থিতিতেও কল্পনা দত্তের লড়াইয়ের প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। ভূমি সংস্কার, শ্রমিকের অধিকার এবং বিশেষ করে ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’র মাধ্যমে নারীদের স্বনির্ভর ও আত্মরক্ষায় দক্ষ করার যে অগ্রণী ভূমিকা তিনি পালন করেছিলেন, তা বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক মৌলিক দিশারি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, লড়াই কেবল শাসনের পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং শোষণের মূল উপড়ে ফেলার জন্য। কল্পনা দত্তকে কেবল একটি অতীতের প্রস্তর মূর্তি হিসেবে নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনের এক শক্তিশালী ‘ব্লু-প্রিন্ট’ বা নকশা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা একটি অসম্পূর্ণ স্বপ্ন মাত্র।


