নিজস্ব প্রতিবেদন:
দক্ষিণ ২৪ পরগনার নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র দীপ্তাংশু মাহাতোর রহস্যজনক মৃত্যু রাজ্যজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এক মেধাবী ও সুস্থ-সবল ছাত্র কীভাবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রাণ হারালেন, তা নিয়ে পরিবার, সহপাঠী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত গরম চা পান করার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে বলে জানা গেলেও, ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। পুলিশ তদন্ত, ময়নাতদন্ত এবং হাসপাতালের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিই এখন এই মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনের প্রধান ভিত্তি।
দীপ্তাংশু মাহাতো কে?
দীপ্তাংশু মাহাতো উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা এবং নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ের ২০২৭ সালের উচ্চ মাধ্যমিক ব্যাচের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। পরিবার, বন্ধু ও শিক্ষকদের কাছে তিনি একজন শান্ত, মেধাবী ও প্রাণবন্ত ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবলের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল।
তাঁর আকস্মিক মৃত্যু শুধু পরিবার নয়, গোটা শিক্ষাঙ্গনকেই স্তম্ভিত করেছে।
ঘটনাক্রম: কী ঘটেছিল সেই দিন?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ঘটনার সম্ভাব্য সময়রেখা—
সকাল ৯:৪৫–১০:০০
বিদ্যালয়ে একটি ফ্লাস্ক থেকে দীপ্তাংশু অত্যন্ত গরম চা পান করেন বলে অভিযোগ।
এরপরই
চা পান করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি তীব্র কাশি, গলায় জ্বালা এবং কথা বলতে অসুবিধার মতো সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন।
কয়েক ঘণ্টা পর
পরিবারের অভিযোগ, ছাত্রের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলেও তাঁকে অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়নি।
দুপুর প্রায় ১টা
দীপ্তাংশুর বাবা বিদ্যালয়ে পৌঁছে ছেলেকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান এবং নিজেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন।
হাসপাতালের পথে
পরিবারের দাবি, একটি নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি নিতে অস্বীকার করা হয়। পরে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় দীপ্তাংশু অচেতন হয়ে পড়েন।
হাসপাতালে
চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়ে?
নরেন্দ্রপুর থানায় একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু হয়েছে।
পুলিশ বর্তমানে তদন্ত করছে—
- বিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ
- প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
- চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি
- ময়নাতদন্তের রিপোর্ট
- ফ্লাস্ক ও অন্যান্য সম্ভাব্য আলামত
চূড়ান্ত ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
পরিবারের অভিযোগ
দীপ্তাংশুর পরিবারের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
তাদের দাবি—
- অসুস্থ হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি।
- পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝা সত্ত্বেও সময় নষ্ট হয়েছে।
- হাসপাতালে পৌঁছাতে অযথা বিলম্ব হয়েছে।
- বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই ছেলেকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
পরিবার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
ঘটনার পর বিদ্যালয় প্রশাসন বেশ কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
জানা গেছে—
- প্রধান শিক্ষক পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
- গাফিলতির অভিযোগে তিনজন কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
- অভ্যন্তরীণ তদন্তও শুরু হয়েছে।
তবে এই পদক্ষেপকে পরিবার যথেষ্ট মনে করছে না।
চিকিৎসাবিদদের মতে কী হতে পারে?
চিকিৎসকদের মতে, অত্যন্ত গরম তরল সরাসরি পান করলে—
- খাদ্যনালীতে মারাত্মক পোড়া লাগতে পারে।
- শ্বাসনালী ফুলে গিয়ে শ্বাসকষ্ট তৈরি হতে পারে।
- তীব্র ব্যথা ও শকের কারণে হৃদ্যন্ত্রের জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাগুলি এখনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাধারণ ব্যাখ্যা। দীপ্তাংশুর ক্ষেত্রে কোনটি ঘটেছে, তা কেবল ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষাই নিশ্চিত করতে পারবে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
সহপাঠীদের বক্তব্য অনুযায়ী, চা পান করার পর থেকেই দীপ্তাংশু অস্বস্তি অনুভব করছিলেন।
অন্যদিকে পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, যখন তারা বিদ্যালয়ে পৌঁছান, তখন ছেলের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক ছিল।
তদন্তকারীরা প্রত্যেক সাক্ষীর বক্তব্য মিলিয়ে দেখছেন যাতে ঘটনার প্রকৃত ক্রম নির্ধারণ করা যায়।
অমীমাংসিত প্রশ্ন
এই মামলায় এখনও একাধিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি—
- চা এতটা গরম ছিল কেন?
- ছাত্র অসুস্থ হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া হয়নি কেন?
- বিদ্যালয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল?
- প্রথম হাসপাতালে ভর্তি না নেওয়ার অভিযোগ সত্য কি?
- ঘটনাস্থলের সমস্ত আলামত কি সংরক্ষণ করা হয়েছে?
- ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কী উঠে আসবে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তরই তদন্তের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণ করবে।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মত
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে চিকিৎসায় বিলম্ব বা প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার কারণে মৃত্যু হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধি ও অন্যান্য প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বলে ধরে নেওয়া আইনসম্মত নয়।
উপসংহার
দীপ্তাংশু মাহাতোর মৃত্যু শুধুমাত্র একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমানে তদন্ত চলছে এবং ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার ও তদন্তকারী সংস্থা। এই মুহূর্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বা কারও দায় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য সামনে আসবে—এটাই এখন সকলের প্রত্যাশা।


