নয়া দিল্লি / নাগপুর — ১৪ আগস্ট: ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে দেশজুড়ে যখন তেরঙা পতাকা সগর্বে উড়ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই পুরো জাতির দৃষ্টি ফিরে যায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার সেই মহাকাব্যিক আত্মত্যাগের ইতিহাসের দিকে। এই উদ্যাপনের নেপথ্যে রয়েছে এক জটিল ঐতিহাসিক দলিল—যেখানে ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ, কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং ঔপনিবেশিক গোয়েন্দা ফাইল একের পর এক উন্মোচিত হয়।
এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)। ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীতে নাগপুরে ডা. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটির লক্ষ্য ছিল সংস্কৃতি পুনর্জাগরণ এবং এক অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতা অর্জন। তবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এর ঠিক কতটা প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল, তা আধুনিক ভারতের অন্যতম চর্চিত ও বিতর্কিত বিষয়।
১. প্রতিষ্ঠাতার দেশপ্রেম ও সংগ্রাম: ডা. কে. বি. হেডগেওয়ার
আরএসএস প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই ডা. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। কলকাতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার সময় তিনি বিপ্লবী দল অনুশীলন সমিতি-র সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন।
- ১৯২১ সালের কারাদণ্ড: মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দিয়ে রাজদ্রোহের অভিযোগে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন হেডগেওয়ার।
- ১৯৩০ সালের সত্যাগ্রহ: লবণ সত্যাগ্রহ এবং জঙ্গল সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করে তিনি পুনরায় কঠোর কারাদণ্ড ভোগ করেন।
- সংগঠনের প্রাথমিক প্রতিজ্ঞা: ১৯২৫ সালে আরএসএস প্রতিষ্ঠার সময় স্বয়ংসেবকদের যে শপথবাক্য পাঠ করানো হতো, তার প্রথম বাক্যই ছিল—"রাষ্ট্র কো স্বতন্ত্র কর" (রাষ্ট্রকে স্বাধীন করো)।
তবে হেডগেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হন: সুসংগঠিত, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং আত্মসচেতন সমাজ গঠন ছাড়া কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা স্থায়ীরূপ পাবে না। তাই তিনি কৌশলগত পথ বেছে নেন—তিনি সদস্যদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন, তবে আরএসএস-কে একটি স্বতন্ত্র আর্থ-সামাজিক সংগঠন হিসেবেই টিকিয়ে রাখেন।
২. ঔপনিবেশিক গোপন ফাইল: ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের দৃষ্টিভঙ্গি
ডিক্লাসিফাইড ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আর্কাইভ পর্যালোচনা করলে ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন-এর সময় আরএসএস সম্পর্কে ব্রিটিশদের দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
আইন-শৃঙ্খলার মূল্যায়ন
১৯৪২ সালের শেষের দিকে বোম্বে প্রাদেশিক সরকারের এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, আরএসএস "আইনের সীমানায় থেকে ১৯৪২ সালের আগস্টে শুরু হওয়া আন্দোলন ও বিশৃঙ্খলা থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে।" স্বরাষ্ট্র দপ্তরও সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, কংগ্রেসের প্রত্যক্ষ আন্দোলনের মতো আরএসএস তাৎক্ষণিক কোনো আইন-শৃঙ্খলার হুমকি সৃষ্টি করেনি।
গোয়েন্দা বিভাগের আশঙ্কাজনক রিপোর্ট
একই সময়ে সেন্ট্রাল প্রভিন্সেসের স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভিন্ন সতর্কবার্তা জারি করে:
১. সামরিক ধাঁচে প্রশিক্ষণ: নাগপুর ও পুনেতে সংঘের ক্যাডাররা লাঠিখেলা, শারীরিক কসরত এবং সামরিক ধাঁচে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বলে ব্রিটিশ পুলিশ উদ্বেগের সাথে নোট করে।
২. গোপন অনুপ্রবেশ: তৎকালীন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, সংঘের কাজ "সরকারি চাকরি এবং সশস্ত্র বাহিনীতেও প্রবেশ করেছে।" এম. এস. গোলওয়ালকরের মতো "সচেতন ও দূরদর্শী" নেতৃত্বের অধীনে সংস্থাকে অত্যন্ত ব্রিটিশবিরোধী বলে চিহ্নিত করা হয়।
৩. উত্তেজক বক্তব্য: ১৯৪২ সালের এপ্রিলে পুনেতে এক সভায় গোলওয়ালকর ব্রিটিশদের সাহায্যকারীদের তীব্র সমালোচনা করেন এবং যুবসমাজকে মাতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গ করার আহ্বান জানান।
৩. মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা: প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা বনাম ব্যক্তিগত বলিদান
প্রাতিষ্ঠানিক নীতি অনুযায়ী আরএসএস দলগতভাবে সত্যাগ্রহে যোগ না দিলেও, হাজার হাজার স্বয়ংসেবক ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| ১৯৪২ সালের আন্দোলনের দ্বিবিধ বাস্তবতা |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান ব্যক্তিগত ক্যাডারদের ভূমিকা |
| • সরাসরি দমন-পীড়ন এড়াতে আন্দোলন থেকে • ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও জঙ্গল |
| অফিশিয়াল দূরত্ব বজায় রাখা। সত্যাগ্রহে সক্রিয় অংশগ্রহণ। |
| • দীর্ঘমেয়াদী ক্যাডার ভিত্তি গঠনে নজর। • আত্মগোপনে থাকা বিপ্লবীদের নিরাপদ |
| • সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলা। আশ্রয় প্রদান। |
| • সর্বোচ্চ ত্যাগ: চিমুরে রামদাস |
| রামপুরের শহীদ হওয়া। |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
১৯৪২ সালের ১৬ আগস্ট মহারাষ্ট্রের চিমুর-এ এক সহিংস সংঘর্ষে আরএসএস স্বেচ্ছাসেবক রামদাস রামপুর পুলিশ গুলিতে শহীদ হন এবং স্থানীয় শাখার প্রধান দাদা নায়ক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। এছাড়া অরুণা আসফ আলী এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ নেতাদের আশ্রয় দিতেও স্বয়ংসেবকরা সক্রিয় ছিলেন।
৪. স্বাধীনোত্তর ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিতর্কিত উত্তরাধিকার
ভারতের মুক্তিযুদ্ধে আরএসএসের অবদান নিয়ে মূলত দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত রয়েছে:
| বিশ্লেষণের দিক | জাতীয়তাবাদী ও আরএসএস-সমর্থিত দৃষ্টিভঙ্গি | সমালোচনামূলক ও একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গি |
| প্রতিষ্ঠাতার ভূমিকা | হেডগেওয়ারকে একজন বীর 'দেশভক্ত' হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার জেল খাটার ইতিহাস সর্বজনবিদিত। | প্রারম্ভিক সত্যাগ্রহে ব্যক্তিগত অংশগ্রহণের সত্যতা মেনে নেওয়া হলেও, ১৯২৫-এর পর কংগ্রেসের আন্দোলন থেকে দূরত্বকে চিহ্নিত করা হয়। |
| ১৯৪২-এর ভূমিকা | সংগঠনকে ব্রিটিশদের হাত থেকে রক্ষা করে হাজার হাজার সদস্যকে ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলনে নামানোর কৌশল বলে দাবি করা হয়। | ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক অনুপস্থিতি হিসেবে সমালোচনা করা হয়। |
| সরকারি স্বীকৃতি | ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী কর্তৃক হেডগেওয়ারের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশকে বড় স্বীকৃতি হিসেবে ধরা হয়। | ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর আরএসএস নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকেও এই উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবে দেখা হয়। |
উপসংহার: ১৫ আগস্টের চেতনা
স্বাধীনতার বর্ষপূর্তির এই শুভক্ষণে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক আর্কাইভগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট অর্জিত স্বাধীনতা কোনো একক পথের ফসল ছিল না। অহিংস গণ-সত্যাগ্রহ, সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রাম এবং দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক জাগরণ—এই সবকটি ধারার সম্মিলিত ফলেই অর্জিত হয়েছিল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।


