বিশেষ সংবাদ সংবাদদাতা, কলকাতা:
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে কেন্দ্র সরকারের শিক্ষানীতি ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে সূচিত ছাত্র-যুব আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে গেল কলকাতায়। উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রামমোহন লাইব্রেরী হলে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA) ও রেভোল্যুশনারি ইউথ অ্যাসোসিয়েশন (RYA)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক রাজ্যস্তরের ছাত্র-যুব কনভেনশনে এই রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কনভেনশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন AISA-এর সর্বভারতীয় সভানেত্রী কমরেড নেহা। এছাড়া মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী ছাত্র-যুব সংগঠনের প্রতিনিধি, নাগরিক আন্দোলনের বিশিষ্ট মুখ, শিক্ষক ও সাংবাদিকরা।
আলোচনার মূল রূপরেখা ও বিশিষ্ট বক্তাবৃন্দ
কনভেনশনে জাতীয় ও রাজ্য স্তরের একাধিক স্পর্শকাতর বিষয় তুলে ধরে একটি সমন্বিত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়:
- শিক্ষাব্যবস্থার সংকট: ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র অনিয়ম, নিট (NEET) পরীক্ষা কেলেঙ্কারি বাতিল এবং 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০' (NEP 2020) প্রত্যাহারের দাবি।
- কর্মসংস্থান ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন: পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘায়িত রাজ্য স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) নিয়োগ দুর্নীতি এবং বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের ধারাবাহিক লড়াই।
- নাগরিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার: আরজি কর চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা 'অভয়া আন্দোলন' এবং চিকিৎসকদের ন্যায়বিচারের দাবি।
কনভেনশনে বক্তব্য রাখেন RYA-এর রণজয় সেনগুপ্ত, SFI-এর প্রণয় কার্য্যী, AIDSO-এর বিশ্বজিৎ রায়, প্রবীণ সাংবাদিক মাহবিশ খান, অভয়া আন্দোলনের অন্যতম মুখ ড. দেবাশিস হালদার, এসএসসি শিক্ষক আন্দোলনের সংগঠক মেহবুব মন্ডল এবং অধ্যাপক মানস ঘোষ। বক্তারা একসুরে জানান যে, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা জনক্ষোভ ও আন্দোলনকে একটি একক গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করাই এই কনভেনশনের প্রধান লক্ষ্য।
AISA সভানেত্রী কমরেড নেহার বক্তব্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ
কনভেনশনের মূল বক্তা কমরেড নেহা তাঁর বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ছাত্র-যুব সমাজের দায়িত্ব নিয়ে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন:
- ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও প্রতিরোধ সংস্কৃতি: দিল্লিতে ছাত্র নিগ্রহের বিরুদ্ধে কলকাতায় গড়ে ওঠা প্রতিবাদ এবং শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর বিপ্লবী ঐতিহ্যকে স্মরণ করে তিনি বলেন, প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের শিকড় বঙ্গভূমির সামাজিক সংস্কার ও প্রতিরোধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাব যুক্ত।
- দক্ষিণপন্থী বিকল্পের রূপরেখা প্রত্যাখ্যান: শাসকদলের নীতিগত ব্যর্থতা ও দুর্নীতির ফলে সৃষ্ট সামাজিক হতাশাকে কোনো অবস্থাতেই চরম প্রতিক্রিয়াশীল বা দক্ষিণপন্থী বিভাজনমূলক রাজনীতির হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক সংকটের প্রকৃত সমাধান কোনো উগ্র বিকল্প নয়, বরং প্রগতিশীল জনমুখী সচেতনতা।
- গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা: নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের সুসংগঠিত আন্দোলনই একমাত্র শক্তি যা রাষ্ট্রকে সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ করতে পারে।
- কবীন্দ্র-ভাবনায় ভয়হীন সমাজ গঠন: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির" কবিতার মূল চেতনাকে সামনে রেখে তিনি উল্লেখ করেন, ভয়হীন চিন্তাপ্রকাশ, অবিকৃত শিক্ষা এবং অধিকার রক্ষার লড়াই-ই সুস্থ সমাজের ভিত্তি। রাজপথে শিক্ষক ও চিকিৎসকদের বঞ্চনার প্রতিবাদকে তিনি আধুনিক ভারতের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত
রামমোহন লাইব্রেরী হলের এই মহাসমাবেশ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবাদ সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে রাজপথে থাকা বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে একটি কার্যকর সেতু নির্মাণ করেছে। জাতীয় ও রাজ্য—উভয় স্তরের প্রশাসনিক ও নীতিগত ব্যর্থতার বিরুদ্ধে আগামী দিনে একটি বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে কনভেনশনের সমাপ্তি ঘটে।






