নতুন দিল্লি: জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) প্রাক্তন গবেষক ও গবেষক-ছাত্র শারজিল ইমামকে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে টানা চার বছর ধরে কেন বন্দী করে রাখা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন।
গ্রেপ্তারের কারণ ও অভিযোগসমূহ
২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি বিহারের কাকাতিন থেকে পুলিশ শারজিল ইমামকে গ্রেপ্তার করে। মূলত দুটি প্রধান ধারায় এবং ভিন্ন ভিন্ন একাধিক মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে:
- উস্কানিমূলক বক্তব্য ও দেশদ্রোহ: ২০১৯ সালের শেষ এবং ২০২০ সালের শুরুতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (AMU) সহ বেশ কয়েকটি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) বিরোধী সমাবেশে তাঁর দেওয়া একটি বক্তব্যের ভিডিয়ো প্রকাশ পায়। অভিযোগ ওঠে, তিনি বক্তব্যে আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য পথ অবরোধ ("চাক্কা জাম") করার কথা বলেছিলেন। এর পরেই তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা ছড়ানোর অভিযোগে দিল্লি, আসাম, উত্তর প্রদেশ, মণিপুর ও অরুণাচল প্রদেশে মামলা করা হয়।
- দিল্লি দাঙ্গার চক্রান্ত (FIR 59/2020): ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, তাকে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশ শারজিল ইমাম ও উমর খালিদসহ বেশ কয়েকজন সক্রিয় কর্মীর বিরুদ্ধে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের (Larger Conspiracy) অভিযোগ এনে ‘ইউএপিএ’ (UAPA - Unlawful Activities Prevention Act) বা সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর আইন প্রয়োগ করে।
পুলিশের দাবি, সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের নামে পরিকল্পিতভাবে এই দাঙ্গার ছক ও উস্কানি দেওয়া হয়েছিল।
আইনি জটিলতা ও জামিনের বর্তমান পরিস্থিতি
শারজিল ইমাম মূল রাষ্ট্রদ্রোহ সংক্রান্ত কিছু মামলায় জামিন পেলেও, UAPA-র অধীনে থাকা দাঙ্গা চক্রান্ত মামলাটি তাঁর মুক্তি আটকে দিয়েছে।
- সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ: ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একই মামলার অন্য পাঁচজন সহ-অভিযুক্তকে জামিন দিলেও, শারজিল ইমাম এবং উমর খালিদের জামিনের আর্জি খারিজ করে দেয়।
সর্বোচ্চ আদালতের বেঞ্চ উল্লেখ করেছিল যে, তদন্তে এই দু'জনকে ষড়যন্ত্রের "মূল নকশাকার ও নির্দেশক" হিসেবে আলাদা স্তরে দেখা হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সুরক্ষিত সাক্ষীদের বয়ান নথিভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সহজে নতুন জামিনের দাবি করতে পারছেন না। - দিল্লি পুলিশের অবস্থান: সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্টে জমা দেওয়া উত্তরে দিল্লি পুলিশ পুনরায় স্পষ্ট করে যে, শারজিল ও উমর সাধারণ আন্দোলনকারী নন, বরং ওই ঘটনার নেপথ্য পরিকল্পনাকারী, তাই তাঁদের জামিনের বিরোধিতা বহাল থাকবে।
বিতর্ক ও দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
শারজিল ইমামের ধারাবাহিক জেলবন্দিত্ব নিয়ে দেশের সামাজিক ও আইনি পরিমণ্ডলে গভীর বিতর্ক বজায় রয়েছে:
- সরকার ও প্রসিকিউশন পক্ষের দাবি: ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে হিংসা উসকে দেওয়া এবং দেশের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করার মতো গুরুতর অপরাধে তিনি জড়িত। ইউএপিএ-র কঠোর শর্তাবলী অনুসারে তাঁর ক্ষেত্রে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ থাকায় আদালত তাঁকে জামিন দিচ্ছে না।
- সমর্থক ও নাগরিক সমাজের দাবি: বিরোধীদের একাংশ, মানবাধিকার সংগঠন ও সমর্থকদের মতে, শারজিল ইমাম একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ (আইআইটি বম্বে-র প্রাক্তন B.Tech/M.Tech এবং জেএনইউ-এর গবেষক)। সিএএ ও এনআরসির মতো নীতিবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রতিবাদী মুখ হওয়ার কারণেই রাষ্ট্রদ্রোহ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার করে বিনা বিচারে দীর্ঘসময় ধরে তাঁকে আটকে রাখা হচ্ছে।


