" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory বিশেষ প্রতিবেদন: স্বাধীন বাংলার প্রথম সার্বভৌম রূপকার সম্রাট শশাঙ্ক—ইতিহাস, সংগ্রাম ও তাঁর অমর অবদান //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

বিশেষ প্রতিবেদন: স্বাধীন বাংলার প্রথম সার্বভৌম রূপকার সম্রাট শশাঙ্ক—ইতিহাস, সংগ্রাম ও তাঁর অমর অবদান

 



কলকাতা: প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় সম্রাট শশাঙ্ক (আনুমানিক ৫৯০–৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী নাম। খণ্ড-বিখণ্ড, সামন্ত-শাসিত ও বহিরাগত সাম্রাজ্যের ছায়াতলে থাকা প্রাচীন বাংলাকে প্রথমবারের মতো একটি সুসংবদ্ধ, শক্তিশালী ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন তিনি। ইতিহাসবিদদের মতে, শশাঙ্ক কেবল একজন দূরদর্শী শাসকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় রাজনীতির দরবারে বাঙালির আত্মপরিচয় ও জাতীয়তাবোধের প্রথম ঐতিহাসিক রূপকার।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও গৌড় রাজ্যের উত্থান

৭ম শতাব্দীর সূচনালগ্নে উত্তর ভারতের বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সমগ্র বাংলাজুড়ে চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা যায়। ছোট ছোট আঞ্চলিক সামন্তরা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে লিপ্ত ছিলেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে শশাঙ্ক প্রথমে ‘মহাসামন্ত’ হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক শক্তি বলে সমগ্র অঞ্চলকে একত্র করেন। রাঢ়, বরেন্দ্র, সমতট ও বঙ্গীয় জনপদগুলোকে সমন্বিত করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্বাধীন ‘গৌড় সাম্রাজ্য’। তিনি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় রাজবাড়িডাঙ্গার (চিরুটি) কাছে ‘কর্ণসুবর্ণ’-কে তাঁর সমৃদ্ধশালী রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন।

সামরিক প্রজ্ঞা ও কনৌজের সঙ্গে মহাসংগ্রাম

শশাঙ্কের শাসনকালের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল তৎকালীন উত্তর ভারতের কেন্দ্রস্থল ‘কনৌজি’ ও থানেশশ্বরের শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর অদম্য সামরিক সংগ্রাম।

  • ভূ-রাজনৈতিক অক্ষ নির্মাণ: থানেশশ্বরের পুষ্পভূতি বংশের রাজা প্রভাকরবর্ধন এবং কনৌজের মৌখরি বংশীয় রাজা গ্রহবর্মণের মধ্যকার বৈবাহিক জোট উত্তর ও পূর্ব ভারতে একাধিপত্য কায়েম করার উদ্যোগ নেয়। এই জোটে কোণঠাসা হয়ে পড়া প্রতিরোধ করতে শশাঙ্ক মালবের শাসক দেবগুপ্তের সাথে এক শক্তিশালী সামরিক মিত্রতা গড়ে তোলেন।

  • রাজ্যবর্ধন ও হর্ষবর্ধনের মুখোমুখি: কনৌজ ও থানেশশ্বরের যৌথ শক্তিকে পরাস্ত করতে শশাঙ্ক ও মালবরাজ সফল অভিযান চালান। এই যুদ্ধে মৌখরি রাজা গ্রহবর্মণ নিহত হন। পরবর্তীতে থানেশশ্বরের জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র রাজ্যবর্ধন যুদ্ধক্ষেত্রে এলে শশাঙ্কের বাহিনীর সাথে সংঘাত বা দরকষাকষিতে রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু ঘটে। এরপর মাত্র ১৬ বছর বয়সে সিংহাসনে বসে হর্ষবর্ধন গৌড়াধিপতি শশাঙ্ককে নির্মূল করার প্রতিজ্ঞা করেন এবং কামরূপের (অসম) রাজা ভাস্কর বর্মণের সাথে জোট বাঁধেন।

  • সার্বভৌমত্ব রক্ষা: পূর্ব দিকে কামরূপ ও পশ্চিম দিকে হর্ষবর্ধনের সুবিশাল বাহিনীর দ্বি-পাক্ষিক চরম সামরিক চাপ সত্ত্বেও শশাঙ্ক নিজের জীবদ্দশায় গৌড়ের এক ইঞ্চি জমিও হাতছাড়া হতে দেননি। মগধ, উৎকল (ওড়িশা) এবং কঙ্গোদ (দক্ষিণ ওড়িশা) পর্যন্ত গৌড় সাম্রাজ্যের সীমানা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন তিনি।

অর্থনীতি, প্রশাসন ও মুদ্রা ব্যবস্থা

সম্রাট শশাঙ্কের শাসনকাল কেবল যুদ্ধবিগ্রহেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার এক স্বর্ণযুগ।

  • স্বর্ণমুদ্রা প্রবর্তন: শশাঙ্ক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও উন্নত মানের সোনা এবং রূপার মুদ্রা চালু করেছিলেন। মুদ্রাগুলোর এক পিঠে শিব ও ষাঁড় (নন্দী) এবং অপর পিঠে পদ্মাসনে উপবিষ্ট দেবী লক্ষ্মীর চিত্র খোদাই করা থাকত। এটি তৎকালীন গৌড়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি অর্থনীতির অভাবনীয় উন্নতির সাক্ষ্য দেয়।

  • সুসংগঠিত প্রশাসন: কর্ণসুবর্ণকে কেন্দ্র করে একটি সুবিন্যস্ত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আমলাতন্ত্র গড়ে তুলেছিলেন তিনি, যা পরবর্তীকালে পাল বংশীয় রাজাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় দিকনির্দেশনা দিয়েছিল।


ধর্মীয় বিতর্ক ও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট রচিত ‘হর্ষচরিত’ এবং চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণ বিবরণীতে শশাঙ্ককে একজন ‘বৌদ্ধবিদ্বেষী’ ও ‘নিষ্ঠুর’ শাসক হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয় যে শশাঙ্ক বোধিগয়া থেকে বোধিবৃক্ষ কেটে ফেলেছিলেন এবং বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস করেছিলেন।

তবে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ও অন্যান্য আধুনিক ইতিহাসবিদগণ এই বিবরণগুলোকে রাজনৈতিক শত্রুতা ও ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্ট বলে স্পষ্ট খারিজ করেছেন। ইতিহাসবিদদের মতে, বিজয়ী হর্ষবর্ধনের দরবারি কবি বাণভট্ট রাজনৈতিক শত্রুকে খাটো করতেই এই সাহিত্য তৈরি করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, শশাঙ্ক নিজে পরম শৈব (শিবের উপাসক) হলেও তাঁর নিজস্ব রাজধানী কর্ণসুবর্ণেই বিখ্যাত ‘রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারসহ’ বেশ কয়েকটি সমৃদ্ধ বৌদ্ধ মঠ সচল ছিল, যা হিউয়েন সাং নিজেই তাঁর লেখায় পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন।


বাঙালির ইতিহাসে শশাঙ্কের অমর অবদান

ইতিহাসবিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, শশাঙ্ক ছিলেন "বাঙালির প্রথম ঐতিহাসিক জাতীয় বীর"। কারণ:
১. তিনি বহিরাগত শক্তির শৃঙ্খল ভেঙে প্রথম একটি স্বাধীন ও সার্বভৌমিক বাংলা গড়ে তুলেছিলেন।
২. উত্তর ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাকে সর্বভারতীয় রাজনীতির মূল নিয়ামক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
৩. তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীতে পাল রাজারা ৪০০ বছরের এক দীর্ঘ ও সুবর্ণ সামন্ত-সাম্রাজ্য নির্মাণ করতে পেরেছিলেন।


সম্রাট শশাঙ্ক কেবল অতীতের একজন রাজা নন; তিনি প্রাচীন বাংলায় প্রথম সার্বভৌম রাষ্ট্রগঠন এবং বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের এক অমলিন ঐতিহাসিক স্তম্ভ।

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies