১২ই আগস্ট, ২০২৬। কাল ১৩ই আগস্ট। ঘড়ির কাঁটা যত মধ্যরাতের দিকে এগিয়ে চলেছে, শিল্পনগরী দুর্গাপুরের বাতাসে ততই গাঢ় হয়ে উঠছে এক অদৃশ্য বিষাদ ও রাজনৈতিক রাজনীতির দীর্ঘশ্বাস। দেখতে দেখতে ন'টি বছর কেটে গেছে। কিন্তু দুর্গাপুরের স্টেশন রোড থেকে বেনাচিতি বাজার, কিংবা সিটি সেন্টারের চওড়া অ্যাভিনিউগুলোর অলিগলিতে আজও যেন সেই ২০১৭ সালের ১৩ই আগস্টের সেই আতঙ্কময় রোববারের স্মৃতি সম্পূর্ণ ফিকে হয়ে যায়নি।
যে শহর একদিন কারখানার সাইরেন আর শ্রমিক আন্দোলনের সোচ্চার কণ্ঠে জেগে উঠত, ৯ বছর আগের এই ১৩ই আগস্টে সেই শহরের গণতান্ত্রিক স্পন্দন থমকে গিয়েছিল কয়েক ঘণ্টার জন্য। নির্বাচন কমিশনের খাতায় সেদিন ইতিহাস লেখা হয়েছিল—৪৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪৩টিতেই শাসকদলের একচ্ছত্র জয়। কিন্তু পরিসংখ্যানের সেই '৪৩–০' ফলাফল কি কেবলই এক অবাধ বিজয়ের রূপকথা, নাকি বিরোধী রাজনীতির নিঃশব্দ রাজনৈতিক কোণঠাসাকরণের এক কঠিন বাস্তব?
একটি ক্ষতবিক্ষত রোববারের স্মৃতি
২০১৭ সালের ১৩ই আগস্টের সেই সকালে, লাইনে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষের চোখে ছিল নিজের পুর প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রত্যাশা। কিন্তু বেলা বাড়তেই ছবিটা বদলে যেতে শুরু করে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তের বুথ থেকে খবর আসতে থাকে—পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে, বুথের দরজা বন্ধ, আর বাইরে টহল দিচ্ছে অচেনা চেহারার বহিরাগত যুবকের দল।
যে প্রবীণ নাগরিক বা শিক্ষক সারাজীবন নিজের ভোটটি নিজের হাতে দিয়ে এসেছেন, সেদিন তাদের অনেককেই বিষণ্ণ মুখে বুথ থেকে বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছিল। কোথাও রক্ত ঝরেছিল রাজনৈতিক কর্মীদের, কোথাও ভাঙচুর হয়েছিল গাড়ি, আর অগণিত ভোটারের মনে গেঁথে গিয়েছিল এক গভীর প্রশ্ন—"আমার ভোটটা কি আদৌ গণনায় পৌঁছাল?"
অভিযোগ ও প্রমাণের রাজনৈতিক দোলাচল
বামফ্রন্ট, বিজেপি কিংবা কংগ্রেস—সব বিরোধী শিবির সেদিন একযোগে গর্জে উঠে বলেছিল, "গণতন্ত্রের বস্ত্রহরণ করা হলো!" যদিও রাজ্য নির্বাচন কমিশন আর পুলিশ প্রশাসন দাবি করেছিল, "ভোট মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ও নগণ্য গোলযোগমুক্ত।" কিন্তু সরকারি নথিতে বা কমিশন রিপোর্টে যাই লেখা থাক না কেন, দুর্গাপুরবাসীর রাজনৈতিক স্মৃতি থেকে সেই ক্ষোভ পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। ৪৩টি আসনেই প্রতিপক্ষের এই সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যাওয়া কি কেবলই শাসকদলের জনপ্রিয়তার ফল, নাকি ক্ষমতার জোরে বিরোধীদের পিছু হটতে বাধ্য করার ফল—সেই বিতর্ক আজও অমীমাংসিত।
স্মৃতির লড়াইতে ১৩ই আগস্ট
আজও প্রতি বছর ১৩ই আগস্ট এলেই দুর্গাপুরে কালো ব্যাজ পরা মিছিলে স্লোগান ওঠে। বিরোধী কর্মী-সমর্থকদের কাছে এই দিনটি কেবল এক পরাজিত নির্বাচনের তারিখ নয়; এটি তাদের হারিয়ে যাওয়া অধিকার আর আক্রান্ত গণতন্ত্রের স্মারক—এক করুণ "কালো দিবস"। কিন্তু সময় থেমে থাকেনি। ২০১৭-এর সেই বিষাদ আর ক্ষোভ পরবর্তীকালে ২০১৮-র পঞ্চায়েত, ২০১৯-এর লোকসভা আর ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের জন্ম দিয়েছিল। দুর্গাপুরের রাজপথে বিরোধীদের সেই নিঃশব্দ কান্না পরবর্তীতে ইভিএমের বাক্সে অন্য এক রাজনৈতিক ক্ষোভের রূপ নিয়েছিল।
কাল আবারও ১৩ই আগস্ট। আবারও হয়তো রাস্তায় নামবে প্রতিবাদী মিছিল, প্রেস ক্লাবে বসবে সাংবাদিক সম্মেলন, শাসকদল দাবি করবে তাদের অভূতপূর্ব উন্নয়নের বার্তা, আর বিরোধীরা ফের স্মরণে আনবে "গণতন্ত্র হত্যার ইতিহাস"। কিন্তু দুর্গাপুরের সাধারণ নাগরিকের কাছে ১৩ই আগস্ট আজও এক ব্যথাতুর স্মারক—যা বারবার মনে করিয়ে দেয়, নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় কথা হলো ভোটাধিকারের অধিকার রক্ষা করা।


