" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory রক্ষা ও সম্প্রীতির ঐতিহাসিক দলিল: পৌরাণিক ঐতিহ্য থেকে রবীন্দ্রনাথের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী রাখীবন্ধন //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

রক্ষা ও সম্প্রীতির ঐতিহাসিক দলিল: পৌরাণিক ঐতিহ্য থেকে রবীন্দ্রনাথের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী রাখীবন্ধন

 



কলকাতা — প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ভারতজুড়ে অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে পালিত হয় রাখীবন্ধন উৎসব। সাধারণ মানুষের কাছে এটি মূলত ভাই ও বোনের স্নেহ-ভালোবাসা এবং সুরক্ষার অঙ্গীকারের উৎসব হিসেবে পরিচিত। তবে ইতিহাস ও পৌরাণিক ধর্মগ্রন্থগুলো গভীরভা‌বে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাখীবন্ধনের মূল চেতনা কেবল ভাই-বোনের পারিবারিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল সর্বজনীন প্রতিরক্ষা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতীক।

পৌরাণিক ও বৈদিক প্রেক্ষাপট: সুরক্ষা সূত্র এবং সম্পর্কের বৈচিত্র্য

  • ইন্দ্র ও শচীর পৌরাণিক কাহিনী: ভবিষ্য পুরাণ-এর একটি প্রসিদ্ধ উপাখ্যান অনুসারে, স্বর্গের দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে টানা ১২ বছর ধরে ভয়াবহ যুদ্ধ চলে। একপর্যায়ে দেবরাজ ইন্দ্র পরাস্ত হন এবং তাঁর স্বর্গরাজ্য হাতছাড়া হয়ে যায়। দিশেহারা ইন্দ্র তখন দেবগুরু বৃহস্পতির শরণাপন্ন হন। দেবগুরু শ্রাবণ পূর্ণিমার শুভ তিথিতে এক বিশেষ সুরক্ষা যজ্ঞের আয়োজন করেন। এই অনুষ্ঠানে ইন্দ্রের স্ত্রী শচী (ইন্দ্রাণী) ইন্দ্রের ডান কবজিতে একটি সুমন্ত্রিত ও পবিত্র সুতো বেঁধে দেন, যা রক্ষাসূত্র নামে পরিচিত। এই সূত্রের অলৌকিক প্রভাবে ইন্দ্র পরবর্তীতে যুদ্ধে পরাজিত অসুরদের পরাস্ত করেন এবং স্বরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। অর্থাৎ, ঐতিহাসিকভাবে প্রথম রাখীবন্ধন ছিল এক স্ত্রীর তাঁর স্বামীর সুরক্ষার জন্য নেওয়া বৈদিক সংকল্প।

  • মহাভারতের রাজসূয় যজ্ঞ ও কৃষ্ণ-দ্রৌপদী: মহাভারতের কাহিনীতেও রাখীবন্ধনের রূপক দেখতে পাওয়া যায়। রাজসূয় যজ্ঞের সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হাত থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হলে দ্রৌপদী নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন। এই ভালোবাসার প্রতিদানে কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে আজীবন সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরবর্তীতে কৌরবদের রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় সেই প্রতিশ্রুতির রক্ষা করেন।

  • রাজা বলী ও দেবী লক্ষ্মী: অন্য একটি পৌরাণিক কাহিনীতে দেখা যায়, দৈত্যরাজ বলীর দানশীলতায় মুগ্ধ হয়ে ভগবান বিষ্ণু তাঁর পাতাল পুরীর দ্বারপাল হতে সম্মত হন। কিন্তু দেবী লক্ষ্মী স্ব স্বামীকে বৈকুন্ঠে ফিরিয়ে নিতে শ্রাবণ পূর্ণিমায় এক সাধারণ নারীর বেশে রাজা বলীর হাতে একটি রক্ষাসূত্র বাঁধেন এবং তাঁকে ভাই হিসেবে সম্বোধন করেন। উপহার হিসেবে তিনি বলীর কাছ থেকে ভগবান বিষ্ণুর মুক্তি চেয়ে নেন।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পৌরাণিক কাল অতিক্রম করে বিশ শতকের প্রারম্ভে এই ধর্মীয় আচারটি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।

  • ১৯০৫ সালের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বাংলাকে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। ব্রিটিশদের নীতি ছিল "ভাগ করো ও শাসন করো" (Divide and Rule)। হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সংহতি বিনষ্ট করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করাই ছিল এই সিদ্ধান্তের প্রধান উদ্দেশ্য।

  • রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুঝতে পেরেছিলেন যে এই প্রশাসনিক বিভাজনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হতে পারে ভারতীয় সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। তিনি ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ (১৬ই আশ্বিন, ১৩১২ বঙ্গাব্দ)—যেদিন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার কথা ছিল—সেদিন সমগ্র বাংলায় রাখীবন্ধন উৎসব উদযাপনের ডাক দেন।

  • কলকাতা থেকে গঙ্গার তীরে সম্প্রীতির বার্তা: রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ সকালে গঙ্গাস্নান সেরে কলকাতার রাজপথে নেমে আসেন। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একে অপরের কবজিতে রাখী বেঁধে দেন। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং মুসলিম দরজি ও কারিগরদের হাতে রাখী বেঁধে দিয়েছিলেন, যা ছিল ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের মুখে এক বিরাট চপেটাঘাত। কবিগুরু এই উপলক্ষেই রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গান: “বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল / পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান...”

আধুনিক যুগে রাখীবন্ধনের প্রাসঙ্গিকতা

কালক্রমে এই বিস্তৃত সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনটি পরিবারের গণ্ডিতে এসে ভাই-বোনের সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তবে রাখীবন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যেকোনো সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সুরক্ষা প্রদান। ইতিহাস প্রমাণ করে যে রাখী কেবল একটি সুতো নয়—এটি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন ভারতীয় ঐতিহ্য।

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies