দুর্গাপুর: শহীদ স্মৃতি, ফুটবল-উন্মাদনা আর টানটান প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এই তিনের মেলবন্ধনে জমে উঠল ৫৪তম শহীদ ষড়াণন মুখার্জি ও শহীদ সুনীল আচার্য স্মৃতি ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০২৬। স্ফুলিঙ্গ সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংস্থার পরিচালনায় এবং নাগার্জুন রোডের মিলনচক্র ক্লাবের সহযোগিতায় আয়োজিত প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী ম্যাচে নাটকীয় লড়াইয়ের পর ১-০ গোলে উখড়া পূজারী সংঘকে হারিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিল পলাশডিহা আদিবাসী ফুটবল ক্লাব।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় শহীদ বেদীতে রক্তপতাকা উত্তোলন, পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন এবং নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে। রক্তপতাকা উত্তোলন করেন প্রাক্তন বিধায়ক কমরেড সন্তোষ দেব রায়। টুর্নামেন্ট কমিটির পতাকা উত্তোলন করেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা সুখময় বোস। শহীদ বেদীতে মাল্যদান করেন সন্তোষ দেব রায়, সুখময় বোস, প্রফুল্ল মণ্ডল এবং দুর্গাপুর ইস্পাতের পার্টি, ইউনিয়ন ও গণসংগঠনের নেতৃত্ব।
এরপর বিকেল সাড়ে তিনটেয় শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত উদ্বোধনী ম্যাচ—উখড়া পূজারী সংঘ বনাম পলাশডিহা আদিবাসী ফুটবল ক্লাব। ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিচিত হন প্রাক্তন বিধায়ক সন্তোষ দেবরায়, প্রাক্তন জাতীয় ফুটবলার সুব্রত সিনহা এবং বার্নপুর ইস্কো ইস্পাত কারখানার প্রাক্তন ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিলোৎপল রায়।
আক্রমণে উখড়া, রক্ষণে পলাশডিহার জমাট প্রতিরোধ
খেলার শুরু থেকেই উখড়া পূজারী সংঘ তুলনামূলকভাবে বেশি পজেশন ও আক্রমণাত্মক উদ্যোগ নিয়ে খেলতে থাকে। মাঝমাঠ থেকে দ্রুত বল সরিয়ে উইং ব্যবহার করে পলাশডিহার ডিফেন্সের পিছনে জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করে তারা। বেশ কয়েকবার শেষ তৃতীয়াংশে পৌঁছে গোলের সুযোগও তৈরি হয়।
তবে পলাশডিহার রক্ষণভাগ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। কমপ্যাক্ট ডিফেন্সিভ ব্লক তৈরি করে উখড়ার আক্রমণের রাস্তা সংকুচিত করে দেয় তারা। বিশেষ করে গোলরক্ষকের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। উখড়া যতই আক্রমণের গতি বাড়িয়েছে, পলাশডিহা ততই নিজেদের রক্ষণকে নিচে রেখে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকের সুযোগ খুঁজেছে।
ম্যাচের শেষ পর্যায়ে দুই দলের শারীরিক ক্লান্তি স্পষ্ট হলেও উত্তেজনা তখন চরমে। মনে হচ্ছিল, সামান্য একটি ভুলই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। ঠিক সেই মুহূর্তেই আসে ম্যাচের একমাত্র গোল।
সোমনাথ মান্ডির দুরন্ত ফিনিশিংয়ে ম্যাচের ভাগ্য বদল
পলাশডিহা আদিবাসী ফুটবল ক্লাবের ৬ নম্বর জার্সিধারী সোমনাথ মান্ডি দুর্দান্ত একটি আক্রমণে বল পেয়ে সুযোগ নষ্ট করেননি। গোলমুখে জায়গা তৈরি করে তাঁর নেওয়া শক্তিশালী শট উখড়ার জালে জড়িয়ে যায়। ম্যাচের একমাত্র গোলটি শুধু পলাশডিহাকে এগিয়েই দেয়নি, শেষ মুহূর্তে ম্যাচের সম্পূর্ণ গতি বদলে দেয়।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে পলাশডিহার সমর্থকরা। ১-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে সেমিফাইনালের টিকিট পাকা করে পলাশডিহা আদিবাসী ফুটবল ক্লাব। ম্যাচের অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে Man of the Match নির্বাচিত হন গোলদাতা সোমনাথ মান্ডি।
G
প্রবল গরম উপেক্ষা করেও মাঠে ছিল উল্লেখযোগ্য দর্শকসমাগম। দর্শকদের উচ্ছ্বাস, উখড়ার ধারাবাহিক আক্রমণ, পলাশডিহার শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং শেষ মুহূর্তের গোল—সব মিলিয়ে উদ্বোধনী ম্যাচ হয়ে ওঠে প্রতিযোগিতার প্রত্যাশিত উত্তেজনার নিখুঁত সূচনা।
ম্যাচ পরিচালনা করেন দুর্গাপুর রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের রুপাই মুর্মু, সন্দীপ ব্যানার্জি ও বিট্টু সরেন।
শহীদদের স্মৃতিকে সামনে রেখে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় প্রথম ম্যাচেই ফুটবল দেখিয়ে দিল—পজেশন নয়, শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতিয়ে দেয় সঠিক মুহূর্তে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ও নিখুঁত ফিনিশিং।


















