নয়াদিল্লিতে ৮৭ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন আধুনিক ভারতের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সুমিত সরকার (১৯৩৯-২০২৬)। তাঁর তিরোধানের সাথে সাথে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধানী সংগ্রামের নেপথ্য গল্প।
শিক্ষার ‘গেরুয়াকরণ’ ও আইসিএইচআর (ICHR) নথি সেন্সরশিপ
১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় শুরু হওয়া ডানপন্থী পরিবর্তন ও ইতিহাসের পুনর্লিখনের বিরুদ্ধে সুমিত সরকার ছিলেন অন্যতম প্রধান প্রতিবাদী কণ্ঠ।
- ‘টুওয়ার্ডস ফ্রিডম’ প্রকল্প স্তব্ধ (২০০০): ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ (ICHR)-এর আওতায় সুমিত সরকার সম্পাদিত ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ নথি-সংকলন প্রকাশে তৎকালীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র সরকার বাধা দেয়। অনুসন্ধানে প্রকাশ পায়, জাতীয় আন্দোলনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকা সংক্রান্ত অপ্রিয় ঐতিহাসিক সত্য চেপে রাখতেই এই সেন্সরশিপের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
- এনসিইআরটি (NCERT) পাঠ্যক্রম বিতর্ক: পাঠ্যপুস্তক থেকে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দেওয়ার চেষ্টা প্রতিরোধে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা নথিপত্রভিত্তিক একাধিক প্রতি-গবেষণা প্রকাশ করেন।
বাবরি ধ্বংস-উত্তর সময় ও ‘খাকি শর্টস’ অনুসন্ধান
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান নিয়ে তিনি গভীরভাবে বিশ্লেষণমূলক কাজ শুরু করেন।
- ‘খাকি শর্টস অ্যান্ড স্যাফরন ফ্ল্যাগস’ (১৯৯৩): তনিকা সরকার, তপন বসু এবং প্রদীপ দত্তের সাথে যৌথভাবে রচিত এই গবেষণা পুস্তিকায় ডানপন্থী সংগঠনগুলোর ক্যাডার বিন্যাস, তাদের আদর্শগত ভিত্তি এবং শিক্ষায় সাম্প্রদায়িকীকরণের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ জনসমক্ষে আনা হয়।
- তৃণমূল স্তরের ইতিহাসের পুনঃপাঠ: ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ (Subaltern Studies)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেও, পরবর্তীতে তা তাত্ত্বিক জটিলতায় পথ হারালে তিনি তার তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন এবং সাধারণ মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস চর্চায় জোর দেন।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে স্বাধীন অবস্থান
কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলীয় বলয়ে আবদ্ধ না থেকে সুমিত সরকার ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে চিরকাল অনমনীয় অবস্থান নিয়েছেন।
- রবীন্দ্র পুরস্কার প্রত্যাবর্তন (২০০৭): ২০০৪ সালে লাভ করা পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ তিনি ২০০৭ সালে তৎকালীন সিপিআই(এম) চালিত বামফ্রন্ট সরকারকে ফিরিয়ে দেন। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ ও রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের প্রতিবাদেই ছিল এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত।
অল ইন্ডিয়া কিষান সভা (AIKS) সহ বিভিন্ন গণসংগঠন অধ্যাপক সরকারের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করে শিক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায় তাঁর অবদান স্মরণ করেছে। ‘মডার্ন ইন্ডিয়া’ ও ‘মডার্ন টাইমস’-এর মতো আকর গ্রন্থের রচয়িতার এই তিরোধান মূলত ইতিহাস চর্চাকে রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে মুক্ত রাখার এক অপূরণীয় লড়াইয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।


