দুর্গাপুর: রক্তিম ও শ্বেতবর্ণের বেলুন উড়িয়ে, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি এবং খেলার মাঠজুড়ে অগণিত দর্শক সমাগমের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো ৫৪তম শহীদ ষড়ানন মুখার্জী ও শহীদ সুনীল আচার্য মেমোরিয়াল ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬-এর চূড়ান্ত পর্বের খেলা। দুর্গাপুর-৫ অঞ্চলের নাগার্জুন রোডের ঐতিহ্যবাহী মিলন চক্র ক্লাব প্রাঙ্গণে রবিবাসরীয় এই ফাইনাল ম্যাচকে ঘিরে স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে তীব্র উন্মাদনা ও উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়।
প্রতিদ্বন্দীতাপূর্ণ এই ফাইনালে তানসেন অ্যাথলেটিক ক্লাবকে ২–০ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে জয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেয় দুর্গাপুর হিরোজ ক্লাব।
উৎসবমুখর শুভ সূচনা ও আমন্ত্রিত গুণীজন
ম্যাচের শুরুতেই অঞ্চলের স্থানীয় মহিলারা আকাশে লাল ও সাদা রঙের বেলুন উড়িয়ে এই বর্ণাঢ্য ফাইনাল প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা ঘোষণা করেন। এরপর আমন্ত্রিত অতিথিগণ একে একে মাঠে প্রবেশ করে উভয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করে পরিচিত হন এবং তাঁদের উৎসাহিত করেন। টুর্নামেন্ট কমিটির সভাপতি প্রকাশ তরু চক্রবর্তী এবং সাধারণ সম্পাদক শেখর মুখার্জী-সহ আয়োজক কমিটির সক্রিয় সার্বিক তত্ত্বাবধানে সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুশৃঙ্খল ও নান্দনিকভাবে পরিচালিত হয়।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথিদের উপস্থিতি টুর্নামেন্টের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়:
- প্রধান অতিথি: সুরজিৎ মিশ্র, Director-in-Charge (D.S.P./A.S.P./I.P.S.P.)।
- বিশেষ অতিথি: সৌম্য টকদার, Executive Director (Works), D.S.P.; প্রমোদ কুমার সিনহা, C.G.M. (TS–TA), D.S.P. ও সিনিয়র নগর প্রশাসক; এবং অরবিন্দ সরকার, সহকারী নগর প্রশাসক।
- বিশেষ আমন্ত্রিত ক্রীড়াতারকা: ভারতের প্রাক্তন আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকা তরুণ দে (১৯৮৭ সালের SAFF Games-এ সোনাজয়ী ভারতীয় দলের অন্যতম প্রধান সদস্য এবং ভারতের জাতীয় দল ও ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের হয়ে ২৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রতিনিধিত্বকারী.
- অন্যান্য আমন্ত্রিত ব্যক্তিত্ব: প্রাক্তন বিধায়ক সন্তোষ দেবরায় সহ অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট সুধীবৃন্দ।
অনুষ্ঠানের মঞ্চে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের নাম উজ্জ্বল করার অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রাক্তন ফুটবল তারকা তরুণ দে মহাশয়কে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিশেষ সংবর্ধনা জানানো হয়।
খেলার বিবরণ: মাঠে দুর্গাপুর হিরোসের একচ্ছত্র আধিপত্য
রেফারির প্রারম্ভিক বাঁশি বাজার সাথে সাথেই দুর্গাপুর হিরোজ ক্লাব ম্যাচের গতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। খেলা শুরুর প্রথম থেকেই তারা প্রতিপক্ষের অর্ধে আক্রমণাত্মক ফুটবলের পশরা সাজিয়ে বসে। বিশেষ করে দুর্গাপুর হিরোসের ৭ নম্বর জার্সিধারী গতিশীল ফরোয়ার্ড প্রদীপ মুর্মু ডান প্রান্ত ব্যবহার করে একের পর এক বিষাক্ত আক্রমণ গড়ে তোলেন। তাঁর নিখুঁত পাস, ড্রিবলিং এবং চমৎকার বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতায় প্রতিপক্ষের ডিফেন্স বারবার পরাস্ত হতে থাকে।
গ্যালারি ভর্তি দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালি ও উন্মাদের মতো চিৎকারের মধ্যে দুর্গাপুর হিরোসের ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে তানসেন অ্যাথলেটিক ক্লাবের রক্ষণভাগ ব্যাকফুটে চলে যায়। ৭ নম্বর জার্সিধারী প্রদীপ মুর্মুর অসাধারণ ফুটবল শৈলী এবং তাঁরই বাড়িয়ে দেওয়া বল থেকে তৈরি হওয়া দুটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত ২–০ ব্যবধানে জয়ের লক্ষ্য অর্জন করে দুর্গাপুর হিরোজ।
পুরস্কার বিতরণী ও সেরা খেলোয়াড়দের তালিকা
ম্যাচ শেষে আয়োজিত জমকালো পুরস্কার বিতরণী পর্বে টুর্নামেন্টের ট্রফি ও ব্যক্তিগত ক্যাটাগরির পুরস্কারসমূহ তুলে দেন উপস্থিত অতিথিগণ:
- চ্যাম্পিয়ন ট্রফি: দুর্গাপুর হিরোজ ক্লাব (পুরস্কার তুলে দেন ভারতের প্রাক্তন তারকা ফুটবলার তরুণ দে)।
- রানার্স-আপ ট্রফি: তানসেন অ্যাথলেটিক ক্লাব (পুরস্কার তুলে দেন প্রাক্তন মহানাগরিক রথীন রায় ।
- ফেয়ার প্লে ট্রফি: প্রাক্তন বিধায়ক সন্তোষ দেবরায় বিজয়ী দলের হাতে এই ট্রফি তুলে দেন।
- টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (Player of the Tournament): সালাউদ্দীন মির্দ্যা (তানসেন অ্যাথলেটিক ক্লাব)।
- ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় (Man of the Match): সঞ্জু বাগদি, জার্সি নং ১৭ (দুর্গাপুর হিরোজ)।
- সেরা ফরোয়ার্ড (Best Forward): প্রদীপ মুর্মু, জার্সি নং ৭ (দুর্গাপুর হিরোজ)।
- সেরা গোলরক্ষক (Best Goalkeeper): অমিত মান্ডি, জার্সি নং ১ (দুর্গাপুর হিরোজ)।
- সেরা ডিফেন্ডার (Best Defender): সঞ্জয় হেমব্রম, জার্সি নং ১৫ (তানসেন অ্যাথলেটিক ক্লাব)।
শহীদের আত্মত্যাগ ও স্মৃতিকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রেখে আয়োজিত ৫৪তম বছরের এই ঐতিহাসিক ফুটবল প্রতিযোগিতাটি কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, বরং দুর্গাপুরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া আবেগের এক অভূতপূর্ব মিলনমেলা হিসেবে সার্থক রূপ লাভ করে।






















