নয়াদিল্লি — ইটের ধুলো আর ভাঙা রডের স্তূপের মাঝে পড়ে আছে একটি ভেজা খাতা, একজোড়া ছেঁড়া স্নিকার্স আর ইকোনমিক্সের একটা খোলা বই। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া কয়েকটি তরতাজা স্বপ্নের এক হৃদয়বিদারক সাক্ষী যেন এগুলো।
রবিবার দুপুরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লির সত্যনিকেতনের পাঁচতলা একটি হোস্টেল বা পিজি (PG) ভবন আচমকা ভেঙে পড়ে। দিল্লি ইউনিভার্সিটির সাউথ ক্যাম্পাসের কাছে এই সত্যনিকেন এলাকাটি মূলত সারা দেশ থেকে আসা তরুণ শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখর থাকে। নিমেষের মধ্যেই সেই প্রাণোচ্ছল এলাকা পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।
ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে স্বজনহারার কান্না
দেশের প্রতিটি কোণা থেকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী যখন দিল্লিতে পড়তে আসেন, তখন সত্যনিকেন কেবল তাদের থাকার জায়গা থাকে না, হয়ে ওঠে তাদের দ্বিতীয় বাড়ি। এখানেই তারা একা থাকতে শেখে, গভীর রাত পর্যন্ত পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয় আর নিজেদের পরিবারকে গর্বিত করার স্বপ্ন দেখে।
ভবনটি যখন ভেঙে পড়লো, তখন কেবল কংক্রিটের দেওয়াল খসে পড়েনি; ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে অনেকগুলো পরিবারের ভরসা। সন্তানের খবরের আশায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে চোখের জলে অপেক্ষা করছেন উদ্বিগ্ন মা-বাবারা। আর দুর্ঘটনাস্থলে বৃষ্টির মধ্যেই সহপাঠীদের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন তরুণ পড়ুয়ারা, যেন অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায়।
বিপদে হাত বাড়িয়ে দিলো তরুণ সমাজ
দুর্ঘটনার বিশাল শোকের মাঝেও ফুটে উঠেছে মানুষের এক অনন্য মানবিক রূপ। সরু গলিতে ভারী মেশিন পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছুটে যান উদ্ধারকাজে।
নিজের সুরক্ষার কথা না ভেবেই পাথর সরাতে হাত লাগান তরুণরা। ফায়ার ব্রিগেড ও পুলিশ আসার আগেই সহপাঠীদের চিৎকার শুনে সাড়া দিতে থাকেন তারা। দুর্ঘটনাস্থল পরিষ্কার করা, ট্রাফিক সামলানো কিংবা দুর্গত পরিবারগুলোর হাতে জল ও খাবার তুলে দিতে এগিয়ে আসে ছাত্র সংগঠনগুলো।
জীবনের এই চরম অন্ধকারের মুহূর্তেও তারা প্রমাণ করে দিয়েছে—বিপদে কেউ কাউকে ছেড়ে যায় না।
সুরক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার দাবি
বাড়ি ছেড়ে আসা প্রতিটি শিক্ষার্থীর পেছনে থাকে পুরো পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা। তারা একটি নিরাপদ মাথার ওপর ছাদ পাওয়ার যোগ্য, যেখানে কোনো ভীতি ছাড়া পড়াশোনা করা যায়।
উদ্ধারকাজ যখন জোরকদমে চলছে, তখন পুরো ছাত্রসমাজ এক হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারানো জীবনের জন্য গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছেন তারা। পাশাপাশি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এই ধরনের হোস্টেলগুলোর কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের দাবি জোরদার হচ্ছে।
আজ হয়তো তাদের স্বপ্নগুলো কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত, কিন্তু সত্যনিকেনের রাজপথে তরুণদের দেখা এই ভালোবাসা, সাহস আর ঐক্যই তাদের শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ানোর আলো দেখাচ্ছে।


