বিশেষ সংবাদদাতা, গোয়া:
ভারতীয় চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। বর্ষীয়ান অভিনেতা, পরিচালক ও সমাজসেবী নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবারে (৮ অক্টোবর, ২০২৬) ভোরে গোয়ায় নিজের বাসভবনে তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
ঘটনার বিবরণ ও চিকিৎসকদের বক্তব্য
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গোয়ার ডোনা পৌলা এলাকায় অবস্থিত নিজ বাসভবনে তাঁকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা ও কর্মীরা। তড়িঘড়ি তাঁকে নিকটবর্তী মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তাঁকে জীবন ফিরে পেতে টানা ৪৫ মিনিট কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস ও সিপিআর (CPR) প্রদান করেন। তবে সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সকাল ৫:২০ নাগাদ চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, আকস্মিক ও মারাত্মক হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলেই তাঁর এই প্রয়াণ ঘটেছে। আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুযায়ী একটি মেডিকেল-লিগ্যাল কেস (MLC) নথিভুক্ত করা হয়েছে।
চার দশকের অনন্য অভিনয় যাত্রা
১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলায় জন্মগ্রহণকারী বিশ্বনাথ পাটেকর, যিনি চলচ্চিত্র জগতে ‘নানা পাটেকর’ নামে পরিচিতি পান, সত্তরের দশকের শেষের দিকে মারাঠি নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবনের সূচনা করেন। আশির দশকের শেষভাগে এবং নব্বইয়ের দশকে তিনি ভারতীয় মূলধারার হিন্দি সিনেমার চেনা ছাঁচকে একাই বদলে দিয়েছিলেন।
- বাস্তবধর্মী অভিনয় ও ডায়ালগ ডেলিভারি: প্রচলিত রোমান্টিক বা অ্যাকশন হিরোর বদলে তাঁর নিজস্ব দ্রুতগতির সংলাপ পরিবেশন, ক্ষুরধার অভিব্যক্তি এবং নাটকীয় নীরবতা ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিল।
- কালজয়ী চলচ্চিত্র: ১৯৮৯ সালে বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘পরিিন্দা’ ছবিতে খলনায়ক ‘আন্না’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় অভিনয় জগতের মানদণ্ড তৈরি করে দেয়। এরপর ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৪)-এ তাঁর জ্বালাময়ী একক অভিনয় ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তোলা প্রতিবাদী সংলাপ ভারতীয় পপ-কালচারের অংশ হয়ে ওঠে।
- বহুমুখী প্রতিভা: তিনি কেবল খলনায়ক বা রাগী চরিত্রের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ (১৯৯৬)-এ এক বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী বাবার চরিত্রে তাঁর স্পর্শকাতর অভিনয়, ‘আব তাক ছাপ্পান’ (২০০৪)-এ এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট সাধু আগাশের গম্ভীর রূপ, কিংবা ‘ওয়েলকাম’ (২০০৭)-এ ডন উদয় শেট্টির অনন্য কমেডি—সবক্ষেত্রেই তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। মারাঠি চলচ্চিত্র ‘নটসম্রাট’ (২০১৬)-এ অবসরপ্রাপ্ত নাট্যাভিনেতা আপ্পাসাহেব বেলভালকরের চরিত্রটি তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে বিবেচিত।
- পরিচালনা ও সেনাপ্রীতি: ১৯৯১ সালে তিনি নিজে ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাট্যাক’ ছবিটি পরিচালনা করেন। এই ছবির প্রস্তুতির জন্য তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রিতে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁকে সম্মানীয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে ভূষিত করা হয়।
সম্মাননা ও সামাজিক অবদান
সিনেমা ও শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ প্রদান করে। তিনি তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন—‘পরিিন্দা’ ও ‘অগ্নি সাক্ষী’র জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা এবং ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে।
অভিনয় জগতের বাইরে তিনি মহারাষ্ট্রের চরম খরাগ্রস্ত অঞ্চলের কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সাথে যৌথভাবে গড়ে তোলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’ (NAAM Foundation)। রাজনীতি থেকে দূরে থেকেও এই অলাভজনক সংস্থার মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার কৃষক পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, নদী পুনরুজ্জীবন ও জলসংরক্ষণ প্রকল্পে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন।
দেশজুড়ে শোকের ছায়া
নানা পাটেকরের এই আকস্মিক প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী সহ বিনোদন জগত ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর অগণিত অনুরাগী ও সহশিল্পীরা তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।


