নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৩ই মার্চ, ২০২৬
লন্ডন/অমৃতসর: ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ১৩ই মার্চ। সাধারণ এক তারিখ মনে হলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এটি এক অমোঘ প্রতিশোধ এবং অটল দেশপ্রেমের স্বাক্ষর। ১৯৪০ সালের আজকের এই দিনেই লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দম্ভ চুরমার করে দিয়েছিলেন এক ভারতীয় বিপ্লবী— উধম সিং। ২১ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর মাইকেল ও’ডায়ারকে দণ্ড দিয়ে তিনি পূর্ণ করেছিলেন তাঁর আজন্ম শপথ।
এক কিশোরের শপথ ও ২১ বছরের অপেক্ষা
১৯১৯ সালের সেই অভিশপ্ত বৈশাখী বিকেল। অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগের চারপাশ যখন ব্রিটিশ বুলেটের শব্দে প্রকম্পিত, কিশোর উধম সিং তখন স্বচক্ষে দেখেছিলেন সাম্রাজ্যবাদের বীভৎস রূপ। নিরস্ত্র মানুষের লাশের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি যে শপথ নিয়েছিলেন, তা ছিল আগুনের অক্ষরের মতো অমোঘ। পাঞ্জাবের তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও’ডায়ারের নির্দেশে ঘটা সেই গণহত্যার বিচার পেতে উধম সিং দীর্ঘ ২১ বছর এক বুক আগুন চেপে রেখেছিলেন।
ক্যাক্সটন হলের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত
১৯৪০ সালের ১৩ই মার্চ লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে এক সভা চলাকালীন উধম সিং তাঁর বইয়ের পাতা খোদাই করে লুকিয়ে রাখা রিভলভারটি বের করেন। ও’ডায়ার যখন মঞ্চের দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন ২১ বছরের পুঞ্জীভূত ঘৃণা আর দেশপ্রেমের বারুদ বিস্ফোরিত হলো। দুটি নিখুঁত গুলি— আর তাতেই লুটিয়ে পড়ল ব্রিটিশ দম্ভ। অকুতোভয় এই বীর পালানোর চেষ্টা করেননি; বরং বীরের মতো দাঁড়িয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন গ্রেফতারি।
"রাম মোহাম্মদ সিং আজাদ": অখণ্ড ভারতের সত্তা
বিচারের কাঠগড়ায় যখন তাঁকে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন— "রাম মোহাম্মদ সিং আজাদ"। এই একটি নামের মাধ্যমেই তিনি হিন্দু, মুসলিম এবং শিখ সম্প্রদায়ের ঐক্য এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য বাসনাকে তুলে ধরেছিলেন। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, "দেশমাতৃকার পায়ে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করার চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে?"
১৯৪০ সালের ৩১শে জুলাই পেন্টনভিল কারাগারে এই মহান বিপ্লবীর জীবনাবসান ঘটলেও, তাঁর আদর্শ আজও অম্লান। ১৯৭৪ সালে তাঁর দেহাবশেষ স্বাধীন ভারতের মাটিতে ফিরিয়ে আনা হয়। আজকের এই দিনে সমগ্র ভারতবাসী শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে 'শহীদ-ই-আজম' উধম সিং-কে। তাঁর এই বীরত্বগাথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক না কেন, ন্যায়ের জয় অনিবার্য।


