উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সংকটে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ধস
২০২৬ সালের শুরুতে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (GCC) দেশগুলো প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি রাজস্ব হারিয়েছে। মূলত হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার কারণে এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ইরানি হামলায় সৌদি আরবের শোধনাগার এবং কাতারের এলএনজি (LNG) স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে। হাইড্রোকার্বন নির্ভর এই অর্থনীতির দেশগুলো এখন তাদের বাজেট ঘাটতি মেটাতে সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের (Sovereign Wealth Funds) ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
ইরানের ‘লং গেম’ বা দীর্ঘমেয়াদী কৌশল
ইরান বর্তমানে কয়েক দশকের পরিকল্পিত একটি ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’ (War of Attrition) কৌশল অবলম্বন করছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি উন্নত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি না লড়ে, বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড এবং প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করাই তেহরানের লক্ষ্য। নিরপেক্ষ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি সম্পদে আঘাত হেনে তারা মূলত বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে নিয়ে যেতে চায়। এর মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। এই "মোজাইক ডিফেন্স" কৌশলটি দ্রুত বিজয়ের চেয়ে শত্রুর খরচ বাড়ানো এবং দীর্ঘস্থায়ী টিকে থাকাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
জিসিসি (GCC) দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব
| দেশ/বিভাগ | প্রধান প্রভাব | সম্ভাব্য ক্ষতি |
| কাতার | রাস লাফানে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ; ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা। | বিশ্ববাজারে ২০% এলএনজি সরবরাহ হ্রাস; পুনরুদ্ধারে কয়েক মাস সময় লাগবে। |
| সৌদি আরব | রাস তানুয়রা শোধনাগার অচল; তেল রপ্তানি স্থগিত। | জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস; পর্যটন ও বিমান চলাচল খাতে ধস। |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত/কুয়েত | হরমুজ প্রণালী বন্ধ; বিকল্প পাইপলাইনে অতিরিক্ত চাপ। | অভিবাসী শ্রমিকদের প্রস্থান; তেল-বহির্ভূত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির। |
| সামগ্রিক জিসিসি | ২০২৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৮% কমে ২.৬ শতাংশে নামবে। | ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব ক্ষতি; প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি। |
উপসাগরীয় দেশগুলো আগে ইরানের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করলেও বর্তমানে এই হামলাগুলোকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছে। এর ফলে তারা এখন পাল্টা প্রতিশোধ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কের দিকে ঝুঁকছে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও ইরানের হিসাব-নিকাশ
এই অস্থিরতা ভারত (যাদের মাত্র ৫০ দিনের রিজার্ভ আছে) এবং চীনের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। এটি জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। ইরানের এই জুয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্টের ঝুঁকি তৈরি করলেও, তারা বিশ্বাস করে যে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেই তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো সতর্ক করেছে যে, হামলা অব্যাহত থাকলে তারা ভয়াবহ পাল্টা জবাব দেবে।


