নিজস্ব প্রতিবেদক | ১ মে, ২০২৬
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা 'মে দিবস' প্রতি বছর ১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। ভারতে এই দিনটির ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় অধ্যায়। আজ, ২০২৬ সালে ভারতের ৫২ কোটিরও বেশি শ্রমিক এই দিনটি উদযাপন করছেন—একটি সংখ্যা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এটি ভারতীয় শ্রম আন্দোলনের বিশালত্ব এবং দেশের অর্থনীতিতে শ্রমিকদের অপরিসীম গুরুত্বকে তুলে ধরে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও হেমার্কেট ট্র্যাজেডি
মে দিবসের ঐতিহাসিক সূচনা হয় ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে। শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা কর্মদিনের দাবিতে এক তীব্র ধর্মঘট শুরু করেন। ৪ মে হেমার্কেট স্কোয়ারে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন শ্রমিক ও পুলিশ প্রাণ হারান। ইতিহাসে এই মর্মান্তিক ঘটনা "Haymarket Affair" বা হেমার্কেট দাঙ্গা নামে পরিচিত। এই ঘটনার স্মরণে এবং শ্রমিকদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে, ১৮৮৯ সালের আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে ১ মে তারিখটিকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ভারতে প্রথম মে দিবস উদযাপন
ভারতে মে দিবস পালনের সূচনা হয় ১৯২৩ সালের ১ মে, তৎকালীন মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই)। এই ঐতিহাসিক দিনটির আয়োজক ছিলেন প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা, সমাজ সংস্কারক এবং আইনজীবী কমরেড সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার (Singaravelar)। মাদ্রাজ হাইকোর্টের সামনের সমুদ্রসৈকত এবং ট্রিপ্লিকেন বিচে দুটি বিশাল সমাবেশের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রথমবারের মতো এই দিবস পালিত হয়েছিল।
লাল পতাকার আত্মপ্রকাশ
ভারতের ইতিহাসে ১৯২৩ সালের মে দিবস আরও একটি কারণে বিশেষভাবে স্মরণীয়। সেই প্রথম মে দিবসের সমাবেশেই ভারতে প্রথমবারের মতো লাল পতাকা উত্তোলিত হয়, যা আজও বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কমরেড সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ারের নেতৃত্বে সেই দিন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও পাশ হয়, যেখানে মে দিবসকে জাতীয় ছুটি হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছিল।
ভারতে মে দিবসের বহুমুখী তাৎপর্য
ভারতে মে দিবস শুধু শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিনই নয়, এর অন্যান্য আঞ্চলিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে:
মহারাষ্ট্র ও গুজরাট দিবস: ১৯৬০ সালের ১ মে ভাষার ভিত্তিতে বোম্বে প্রদেশ ভেঙে মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। তাই মে দিবস এই দুই রাজ্যে যথাক্রমে 'মহারাষ্ট্র দিবস' ও 'গুজরাট দিবস' হিসেবেও অত্যন্ত সমারোহে পালিত হয়।
ভাষাগত বৈচিত্র্য: ভারতে অঞ্চলভেদে এই দিনটির নানা নাম রয়েছে। হিন্দিতে এটি ‘অন্তর্রাষ্ট্রীয় শ্রমিক দিবস’, মারাঠিতে ‘কামগার দিবস’ এবং তামিল ভাষায় ‘উঝাইপালার নাল’ নামে পরিচিত।
সরকারি ছুটি ও উদযাপন: কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, হায়দরাবাদসহ দেশের অধিকাংশ রাজ্যে দিনটি সরকারি ছুটি হিসেবে গণ্য হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন: এই দিনে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে র্যালি, শ্রমিক সমাবেশ, বিশেষ বক্তৃতা এবং শিশুদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
মে দিবস কেবল একটি ছুটির দিন নয়; এটি সেইসব অক্লান্ত পরিশ্রমী মানুষদের প্রতি সম্মান জানানোর দিন, যাঁদের ঘাম ও শ্রমে একটি দেশের ভিত মজবুত হয়। ভারতের প্রেক্ষাপটে এই দিনটির উদযাপন প্রমাণ করে যে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রমিক শ্রেণির অবদান কতটা অপরিহার্য।


