লিখেছেন: শংকর পাল
নয়াদিল্লি, ১৩ জুন: ভারতের ইতিহাসে কিছু দুর্ঘটনা কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকে না, বরং জাতির স্মৃতিতে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন হয়ে রয়ে যায়। ১৯৯৭ সালের ১৩ জুন দিল্লির গ্রিন পার্ক এলাকায় অবস্থিত উপহার সিনেমা হলে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড তেমনই এক ঘটনা। ২৯ বছর পরও সেই দিনের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া ৫৯টি প্রাণ এবং অসংখ্য পরিবারের কান্না আজও দেশবাসীকে নাড়া দেয়।
সেদিন ছিল শুক্রবার। জনপ্রিয় হিন্দি ছবি বর্ডার দেখতে উপহার সিনেমা হলে জড়ো হয়েছিলেন শত শত দর্শক। পরিবারের সদস্য, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে স্বাভাবিক এক বিকেল কাটানোর আশায় এসেছিলেন সবাই। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আনন্দের সেই পরিবেশ পরিণত হয় মৃত্যুকূপে।
কীভাবে ঘটেছিল দুর্ঘটনা?
তদন্তে জানা যায়, সিনেমা হলের নিচতলায় অবস্থিত একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মারে আগুন লাগে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ট্রান্সফর্মার থেকে উৎপন্ন ঘন কালো ধোঁয়া এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে।
প্রথমে দর্শকরা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। কিন্তু ধীরে ধীরে হলের ভেতর ধোঁয়া ঘন হতে থাকলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অন্ধকার নেমে আসে, আর সেই সঙ্গে শুরু হয় জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা।
বন্ধ ছিল জরুরি নির্গমন পথ
দুর্ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক এবং বিতর্কিত দিক ছিল জরুরি নির্গমন পথের অবস্থা। বহু প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, কিছু এক্সিট গেট কার্যকর ছিল না এবং নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হয়নি।
ফলে ধোঁয়ায় ভরা অন্ধকার হলঘর থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে অসংখ্য মানুষ আটকে পড়েন। অধিকাংশের মৃত্যু হয় আগুনে নয়, বরং বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে।
মৃতদের মধ্যে ছিলেন শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী এবং বয়স্ক মানুষ। আহত হন দুই শতাধিক ব্যক্তি।
ন্যায়বিচারের দীর্ঘ লড়াই
উপহার ট্র্যাজেডির পর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। নিহতদের পরিবার, বিশেষ করে নীলম ও শেখর কৃষ্ণমূর্তির মতো অভিভাবকরা বিচার এবং দায়ীদের শাস্তির দাবিতে বছরের পর বছর আদালতের দ্বারস্থ হন।
তাদের দুই সন্তান—উন্নতি ও উজ্জ্বল—সেদিন সিনেমা দেখতে গিয়ে আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে তারা গড়ে তোলেন দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের সংগঠন, যা নিরাপত্তা এবং জবাবদিহিতার দাবিতে দেশজুড়ে সচেতনতা তৈরির কাজ করে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা
তদন্তে একাধিক গুরুতর ত্রুটি সামনে আসে—
পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না।
জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য কার্যকর আলো ছিল না।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক বিধি লঙ্ঘিত হয়েছিল।
প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতি ছিল স্পষ্ট।
এই ঘটনাকে অনেক বিশেষজ্ঞ শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ফল বলে অভিহিত করেছেন।
আজও কেন প্রাসঙ্গিক উপহার ট্র্যাজেডি?
ভারতের বিভিন্ন শহরে আজও বহুতল ভবন, শপিং মল, হাসপাতাল কিংবা বিনোদন কেন্দ্রগুলিতে অগ্নি-নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সময়ে সময়ে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলি মনে করিয়ে দেয় যে উপহার ট্র্যাজেডির শিক্ষা এখনও পুরোপুরি গ্রহণ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা, নিয়মিত অডিট এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা হলে ভবিষ্যতেও এমন বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকে যাবে।
স্মৃতির সামনে নীরব শ্রদ্ধা
প্রতি বছর ১৩ জুন নিহতদের স্মরণে দিল্লিতে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। স্বজনহারাদের চোখের জল আজও শুকায়নি। সময় পেরিয়ে গেলেও সেই বিকেলের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া ৫৯টি জীবন এবং অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্ন ভারতীয় সমাজকে বারবার প্রশ্ন করে—মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কি কোনো লাভ হতে পারে?
উপহার ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনার নাম নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা—নিরাপত্তা অবহেলা, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং মুনাফার লোভ কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তার এক নির্মম স্মারক।
আজ, ১৩ জুনে, আমরা সেই ৫৯ জন নিরপরাধ মানুষের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।


