শংকর পাল | আন্তর্জাতিক সংবাদ
কিশিনাউ, মলদোভা: মলদোভার বামপন্থী রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রজন্মগত পরিবর্তনের সাক্ষী থাকল দেশটি। ঐতিহাসিক Party of Communists of the Republic of Moldova (পিসিআরএম)-এর ১১তম কংগ্রেসে সর্বসম্মতিক্রমে নতুন চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়েছেন Diana Caraman। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি মলদোভার সমকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।
রাজধানী Chișinău-এ অনুষ্ঠিত এই কংগ্রেসে দেশের বিভিন্ন জেলা ও মিউনিসিপ্যালিটি থেকে ২৫৪ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। ২০২১ সালের পর এটিই ছিল দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সম্মেলন, যেখানে শুধু নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নয়, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল, সাংগঠনিক সংস্কার এবং আদর্শিক অবস্থান নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা হয়।
তৃণমূল থেকে জাতীয় নেতৃত্বে
ডায়ানা কারামানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় সাংগঠনিক স্তর থেকে। অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর তিনি সংসদীয় সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে দলের আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন।
২০১৪ সালে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্যের কার্যালয়ে সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট সংসদীয় দলের পরামর্শদাতা ও সহকারী হিসেবে কাজ করে দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে ‘ব্লক অব কমিউনিস্টস অ্যান্ড সোশ্যালিস্টস’ (বিইসিএস)-এর প্রার্থী হিসেবে সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।
বর্তমানে তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা, যুব, ক্রীড়া এবং গণমাধ্যম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কংগ্রেসে উঠে এল রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন
১১তম কংগ্রেসে দলের প্রতিনিধিরা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। বিদায়ী দলীয় প্রধান ও মলদোভার সাবেক রাষ্ট্রপতি Vladimir Voronin তাঁর বক্তব্যে অর্থনৈতিক সংকট, জনগণের আস্থার সংকট এবং বহিরাগত ভূ-রাজনৈতিক চাপের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
কংগ্রেসে বিশেষ গুরুত্ব পায় কয়েকটি মৌলিক বিষয়—
মলদোভার রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরপেক্ষতা রক্ষা
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন
সাংবিধানিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষা
শ্রমিক, পেনশনভোগী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা
দলীয় প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বলেন, মলদোভাকে একটি শক্তিশালী সামাজিক কল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করাই আগামী দিনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
যুগোপযোগী নতুন কর্মসূচি গ্রহণ
কংগ্রেসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল একটি নতুন ও সংশোধিত দলীয় কর্মসূচি গ্রহণ। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা Konstantin Starîș নতুন কর্মসূচির খসড়া উপস্থাপন করেন।
তার মতে, দুই দশকেরও বেশি আগে প্রণীত কর্মসূচি বর্তমান আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। নতুন কর্মসূচিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং বামপন্থী শক্তির ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ভোরোনিনের জন্য ‘সম্মানসূচক চেয়ারম্যান’ পদ
সাংগঠনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দলের সংবিধিতে একাধিক সংশোধনী আনা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ‘সম্মানসূচক চেয়ারম্যান’ পদ সৃষ্টি।
দলের প্রতিষ্ঠাতা নেতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ভ্লাদিমির ভোরোনিনকে তাঁর রাজনৈতিক অবদান ও নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সর্বসম্মতিক্রমে এই পদে নির্বাচিত করা হয়। পাশাপাশি দেশের সব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি এবং কেন্দ্রীয় নিরীক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে।
নতুন নেতৃত্ব কাঠামো
কংগ্রেস-পরবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম অধিবেশনে ডায়ানা কারামানকে আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। একই সঙ্গে কনস্ট্যান্টিন স্ট্যারিশ এবং Vladimir Telnov-কে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিজ্ঞ ও তরুণ নেতৃত্বের এই সমন্বয় দলের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে নতুন গতি আনতে পারে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, ডায়ানা কারামানের নির্বাচন কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং মলদোভার বাম রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের উত্থানের প্রতীক। এটি দেখিয়ে দেয় যে, পিসিআরএম তার সমাজতান্ত্রিক আদর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চায়।
মলদোভার বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে এই নেতৃত্ব পরিবর্তন দেশের প্রগতিশীল, শ্রমিক ও সমাজতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কংগ্রেসের সমাপনী অধিবেশনে দেশের জনগণের প্রতি এক ঐক্যবদ্ধ আহ্বান জানানো হয়—রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার জন্য।






