আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ভিউস নাও:
১৯৫১ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া একটি বিচার আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং মানবাধিকার নিয়ে বিতর্কের অন্যতম বড় বিষয়। কথা হচ্ছে জুলিয়াস ও এথেল রোজেনবার্গ-এর বিচার নিয়ে, যা ইতিহাসে "রোজেনবার্গ ট্রায়াল" নামে পরিচিত। শীতল যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে পারমাণবিক গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এই দম্পতিকে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সাত দশকেরও বেশি সময় পরে নতুন নথি, সাক্ষ্য এবং গবেষণা এই মামলার ন্যায়বিচার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
১৯৫১ সালের ৬ মার্চ নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে বিচার শুরু হয়। অভিযোগ ছিল, জুলিয়াস ও এথেল রোজেনবার্গ সোভিয়েত গোয়েন্দাদের কাছে মার্কিন পারমাণবিক প্রকল্প সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের বিচার শেষে ২৯ মার্চ জুরি তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে। ৫ এপ্রিল বিচারক আরভিং কফম্যান মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। পরে ১৯৫৩ সালের ১৯ জুন নিউইয়র্কের সিং সিং কারাগারে বৈদ্যুতিক চেয়ারে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
জুলিয়াসের অপরাধ প্রমাণিত, কিন্তু এথেল?
পরবর্তী কয়েক দশকে প্রকাশিত সোভিয়েত নথি, ভেনোনা ডিক্রিপশন এবং কেজিবি আর্কাইভ থেকে প্রায় নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে জুলিয়াস রোজেনবার্গ সোভিয়েতদের জন্য গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ঘিরে রয়েছে তাঁর স্ত্রী এথেল রোজেনবার্গকে।
মামলার প্রধান সাক্ষী ছিলেন এথেলের ভাই ডেভিড গ্রিনগ্লাস। তিনি আদালতে দাবি করেছিলেন, এথেল পারমাণবিক তথ্য টাইপ করে গুপ্তচর চক্রকে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু ২০০১ সালে গ্রিনগ্লাস নিজেই স্বীকার করেন যে তিনি এই বিষয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী রুথ গ্রিনগ্লাসকে রক্ষা করার জন্য এথেলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।
পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, এথেল স্বামীর কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত থাকতে পারেন, কিন্তু সরাসরি গুপ্তচরবৃত্তিতে অংশ নেওয়ার প্রমাণ অত্যন্ত দুর্বল ছিল। ফলে বহু ইতিহাসবিদের মতে, এথেলের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ছিল অযৌক্তিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।
বিচারক ও প্রসিকিউশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রোজেনবার্গ মামলার আরেকটি বড় বিতর্ক হলো বিচারিক নিরপেক্ষতা। বিচারক আরভিং কফম্যান ছিলেন কঠোর কমিউনিস্ট-বিরোধী। রায় ঘোষণার সময় তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে রোজেনবার্গ দম্পতির কর্মকাণ্ড কোরিয়ান যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। সমালোচকদের মতে, এমন মন্তব্য বিচারকের নিরপেক্ষ অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রসিকিউশন পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল ও বিভ্রান্তিকর সাক্ষ্য ব্যবহার করেছিল। বিশেষ করে এথেলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য আদায়ে চাপ প্রয়োগ এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার করার অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে।
মৃত্যুদণ্ড কি অত্যন্ত কঠোর ছিল?
রোজেনবার্গ দম্পতি ছিলেন শান্তিকালীন সময়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একমাত্র মার্কিন বেসামরিক নাগরিক। এথেল রোজেনবার্গ ছিলেন ১৮৬৫ সালের পর মার্কিন সরকারের হাতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম নারী।
তৎকালীন বিশ্বের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁদের প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছিলেন। বিজ্ঞানী Albert Einstein, মার্কিন প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি Eleanor Roosevelt এবং Pope Pius XII-সহ বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব মৃত্যুদণ্ড রদের আহ্বান জানান। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন সেই আবেদন গ্রহণ করেনি।
শীতল যুদ্ধের আতঙ্কের প্রতীক
বিশ্লেষকদের মতে, রোজেনবার্গ বিচার কেবল একটি গুপ্তচরবৃত্তির মামলা ছিল না; এটি ছিল শীতল যুদ্ধের সময় মার্কিন সমাজে ছড়িয়ে পড়া "রেড স্কেয়ার" বা কমিউনিজম-ভীতির প্রতিফলন। সেই সময়ে হাজার হাজার বামপন্থী, শ্রমিক সংগঠক, বুদ্ধিজীবী এবং সমাজকর্মী রাজনৈতিক সন্দেহের মুখে পড়েছিলেন।
ফরাসি দার্শনিক Jean-Paul Sartre এই বিচারকে "আইনি লিঞ্চিং" বলে অভিহিত করেছিলেন। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণ, জাতীয় নিরাপত্তা আতঙ্ক এবং কমিউনিস্ট-বিরোধী প্রচারের আবহে রোজেনবার্গদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা হয়েছিল।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মামলা?
রোজেনবার্গ মামলার পুনর্মূল্যায়ন আজও চলছে। রোজেনবার্গ দম্পতির দুই পুত্র এখনও এথেলের মরণোত্তর নির্দোষ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য, জুলিয়াস আইনি অর্থে অপরাধী হতে পারেন, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড ছিল অমানবিক; আর এথেলকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হয়েছিল।
ইতিহাসবিদদের মতে, রোজেনবার্গ ট্রায়াল আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—রাজনৈতিক ভয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং জনমতের চাপ যখন বিচারব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে, তখন সত্য ও ন্যায়বিচার প্রায়শই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
১৯ জুন ১৯৫৩ সালে বৈদ্যুতিক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ৭৩ বছর পরও রোজেনবার্গ মামলা মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত বিচার হিসেবে আলোচিত, এবং এটি এখনও রাষ্ট্র, বিচার ও নাগরিক অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।






